অর্থনীতির আবহাওয়া যে কত দ্রুত পাল্টাতে পারে, গত তিন মাসে ভারত তার সাক্ষী থাকল। ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি ছিল ‘আপেক্ষিক ভাবে স্থিতিশীল’: মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণসীমার মধ্যে, বৃদ্ধির হার আশাব্যঞ্জক; নীতিনির্ধারকদের সামনে অনেক দিন পরে সুযোগ এসেছিল অর্থব্যবস্থা অভিপ্রেত অভিমুখে পরিচালনার। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ সেই স্থিতিশীলতাকে বিসর্জন দিয়ে তুমুল অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে দামের চাপ, সারের কাঁচামাল থেকে পরিবহণ ব্যয়— একের অভিঘাত দ্রুত অন্য ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে। ভারতীয় অর্থব্যবস্থায় এই আন্তর্জাতিক ধাক্কা লাগছে, এবং যত দিন না পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে— লাগবেও। এই অবস্থায় নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সুবিবেচনার গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার নির্ধারণে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখার যে নীতি নিয়েছে, তা সেই সুবিবেচনার পরিচায়ক। সাম্প্রতিক মনিটরি পলিসি কমিটির বৈঠকে ব্যাঙ্ক স্থির করেছে, আপাতত রেপো রেট ৫.২৫ শতাংশ হারে অপরিবর্তিত থাকবে।
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের প্রধান দায়িত্ব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। আর্থিক বৃদ্ধির প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হারালে তার অভিঘাত সমাজের বৃহত্তর অংশে অনেক বেশি পড়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতির উপরে চাপ সৃষ্টি করতে পারে একাধিক পথে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যদি চড়তেই থাকে, শেষাবধি দেশের বাজারেও পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়বে বলে আশঙ্কা। তার অভিঘাত পরিবহণ ব্যয় হয়ে বাজারের প্রায় সব পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। দ্বিতীয়ত, সার সরবরাহে ঘাটতি কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিতে পারে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার ফলে সব পণ্যের আমদানিই প্রভাবিত, গোটা অর্থব্যবস্থায় ইতিমধ্যেই তজ্জনিত মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি, এ বছর আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সুদের হার কমানোর মতো পদক্ষেপ বাজারে ভুল বার্তা দিত। মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
তবে, ভারতের উদ্বেগ শুধু মূল্যবৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ-কেন্দ্রিক নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার ধাক্কা ভারত এক মজবুত ভিতে দাঁড়িয়ে সামলাচ্ছে, এমন দাবিরও উপায় নেই। টাকার দামে ধারাবাহিক পতন ঘটেছে, বিদেশি পুঁজির বহির্গমনও উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ-উদ্ভূত মূল্যস্ফীতির চাপ ভারতের জন্য আরও বিপজ্জনক। কারণ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়ায়, সেই ব্যয় ফের মূল্যস্ফীতি উস্কে দেয়। এখানেই রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের সতর্কতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু, একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক পরিচালনার বৃহত্তর ভুলগুলিও ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে উচ্চ প্রচারনির্ভর অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসের আড়ালে যে কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে গিয়েছে— আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা, দুর্বল ও কার্যত একমুখী রফতানি ক্ষেত্র, এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা— যুদ্ধ সেই সব ফাটল আরও স্পষ্ট করে তুলছে। ফলে এই মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কেবল আর্থিক নীতি নয়, বৃহত্তর অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক আপাতত আছে ঠিক পথেই; কিন্তু এই সতর্কতা যেন বৃহত্তর নীতিগত ব্যর্থতা গোপন করার কাজে ব্যবহৃত না হয়, সে দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)