E-Paper

ভদ্রাসন সঙ্কট

স্পষ্ট হোক যে, বাঙালির সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত কীর্তিকাহিনির কেন্দ্রে আছে বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ গোষ্ঠী। জাতীয়তাবাদের উন্মেষকাল থেকেই যে বাঙালির কথা জাতীয় গৌরব বা কৃতিত্ব হিসাবে নথিবদ্ধ করে আসা হয়েছে, তাঁরা সকলেই এই ‘ভদ্রলোক’ বৃত্তে পড়েন।

শেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:২৩

এই সপ্তাহান্ত বাংলা ভাষার উদ্‌যাপনের সময়। এমন শুভক্ষণে, বাংলা ভাষার সূত্রে বাঙালিকেও একটু আতশকাচের তলায় ফেলা যেতে পারে। লক্ষণীয়, কিছু কাল ধরেই চার দিকে বাঙালি পরিচয়ের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, বিতর্কের এক রকম জোয়ার চলেছে, সম্ভবত যার উৎস বাঙালিবিরোধী রাজনীতির আকস্মিক বিস্ফোরণ। এ এক শুভ লক্ষণ। ইতিহাসগত ও সমাজতত্ত্বগত ভাবে, বাঙালি সমাজ বলতে যা বোঝানোর কথা, আর সাধারণত যা বোঝানো হয়, তার মধ্যে ফারাক এতই বড় যে আত্মসচেতনতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ আলোড়ন, আন্দোলন ও সংস্কার, সংশোধনের পথে না এগোলে এই সমাজের স্থিতি ও ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তাই এখনই স্পষ্ট হোক যে, বাঙালির সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত কীর্তিকাহিনির কেন্দ্রে আছে বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ গোষ্ঠী। জাতীয়তাবাদের উন্মেষকাল থেকেই যে বাঙালির কথা জাতীয় গৌরব বা কৃতিত্ব হিসাবে নথিবদ্ধ করে আসা হয়েছে, তাঁরা সকলেই এই ‘ভদ্রলোক’ বৃত্তে পড়েন। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে অভিজাত, অর্থাৎ কায়িক শ্রম থেকে দূরে বিরাজিত। প্রধানত শহরের বাসিন্দা, এবং নিশ্চিত ভাবেই হিন্দু— বাঙালি ভদ্রলোক। কেবল হিন্দু নন— মাত্র তিনটি উচ্চজাতির হিন্দুদেরই দেখা যায় এই গোষ্ঠীতে: ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্য। বাঙালি চেতনা মাত্রেই যে হেতু ‘ভদ্রলোক’ বাঙালি চেতনা, তার বাইরে রয়ে গেল কোন পরিসর, কতখানি পরিসর, তা এই লক্ষণগুলি থেকেই স্পষ্ট।

কবে থেকে ‘ভদ্রলোক’ শব্দটি প্রচলিত হল? তা নিয়েও কম বিতর্ক নেই। ১৮২০-র দশকের আগে এর ব্যবহার জানা যায় না, ক্রমশ তা বাড়তে থাকে, এবং সিপাহি বিদ্রোহের পর সরকারি ভাবে এবং সামাজিক ভাবে প্রচলিত হয়। কলিকাতা কমলালয়, নববাবুবিলাস এই সব বই লিখে খ্যাত ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৭৮৭-১৮৪৮) সম্ভবত শব্দটি প্রথম ছাপার অক্ষরে নিয়ে আসেন। তাঁর লেখায় নব্য বাবু ভদ্রলোকরা প্রভূত ধনসম্পদের অধিকারী, ইউরোপীয় সাহেবদের সংস্পর্শে এসে পিতৃপুরুষের ঐতিহ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি নিয়ে নিরাসক্ত, অনীহ বা প্রশ্নশীল। পরবর্তী কালে এঁরাই জাতীয়তার ভাবনায় নিষিক্ত হতে শুরু করেন, জাতীয় আন্দোলনের পূর্বসূরি হিসাবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বাংলার ‘ভদ্রলোক’ যে ভারতের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের মূল চরিত্র, এ কথা যে ইতিহাসবিদরা বলেছিলেন, তাঁদের শিরোভাগে আছেন জন ব্রুমফিল্ড, তাঁর এলিট কনফ্লিক্ট ইন আ প্লুরাল সোসাইটি (১৯৬৮) বইয়ের সৌজন্যে। অতঃপর বিবিধ গবেষণা-সন্দর্ভের বিষয় হয়েছেন ‘ভদ্রলোক’ প্রজাতি, এমনকি ইংরেজি অভিধানেও শব্দটি স্থান পেয়েছে। স্বাভাবিক, কেননা এই ‘ভদ্রলোক’রাই এশিয়ার প্রথম কোনও সামাজিক গোষ্ঠী যাঁরা ঔপনিবেশিক শাসনের ফসল হিসাবে নিজেদের সমাজে একটা পরিবর্তনের সূচনা করেন, তাঁদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাপক ও গভীর। তাঁদের নিজস্ব শ্রেণিচরিত্রই সেই পরিবর্তনের ধারা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, আবার তার সীমানাও বেঁধে দিয়েছিল।

ইতিহাস এমনও বলবে, ‘ভদ্রলোক’ সমাজের এই চরিত্র স্থির থাকেনি, শতক পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি ভদ্রলোকের ইতিহাসও ক্রমবিবর্তিত হয়েছে। তাঁদের আচরণ, রুচি, মূল্যবোধ বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে, ‘মান্য সংস্কৃতি’ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই গণ্ডির বাইরে যাঁরা, তাঁরা এই বৃত্তে প্রবেশের প্রয়াস করেছেন। আবার ভদ্রলোকদেরও এক বড় অংশ ক্রমে নিজেদের সামাজিক গণ্ডি অতিক্রম করতে চেয়েছেন। এই ক্রমবিবর্তনেই তৈরি হয়েছে বাঙালির ‘নতুন ভদ্রলোক’ সমাজ। প্রধানত উপনিবেশ-পরবর্তী বা নব্য-উপনিবেশবাদী যুগে, বাম-লিবারাল মতাদর্শের ছায়াতে ঘটেছে এই ঘটনা। ক্রমে নিম্নবিত্ত দোকানদার, সাধারণ চাকুরিজীবীরাও ‘ভদ্রলোক’ সম্মানপ্রত্যাশী হয়েছেন, গ্রামের সম্পন্ন কৃষক তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে ‘ভদ্রলোক’ করতে চেয়েছেন। বুঝতে অসুবিধা নেই, এই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর দ্বন্দ্ব, জটিল সংঘাত, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটেছে রাজনীতিও। একুশ শতকের বাঙালি রাজনীতির ধারা-উপধারাকে বুঝতে হলে, এবং বিশেষত আজকের বাঙালি পরিচিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক সংঘাত, তাপ-উত্তাপকে যথার্থ প্রেক্ষিতে দেখতে হলে বাঙালি অর্থাৎ বাঙালি ভদ্রলোকের এই ইতিহাস ভুললে চলবে না। ভাষার রাজনীতি, সত্তার রাজনীতি যতই প্রগতিশীল হোক, তাদের সীমাবদ্ধতাও কিন্তু এখন বাংলার রাজনীতিতে প্রাত্যহিক ভাবে অনুভবযোগ্য।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Bengali Language Bengali Culture

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy