E-Paper

‘পুণ্য হউক’

একটি বহুপ্রচলিত বক্তব্য হল, বাংলা তার আর্থিক গুরুত্ব হারিয়েছে বলে বাংলা ভাষারও জোর চলে গিয়েছে। কথাটির মধ্যে কয়েক আনা সত্য আছে।

শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:২২

বা ‌ংলা ভাষা নিয়ে বাঙালি ভদ্রলোকের বাৎসরিক উচ্ছ্বাসের পার্বণ আজ। ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে রাজনীতি থেকে শেষ অবধি ভাষা শহিদদের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি এসেছিল, সাম্প্রতিক সময় যেন সে প্রতিরোধকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে ভাষা দিবসকে দেখেছিল নেহাত সাংস্কৃতিক উচ্চারণের একটি নির্মল পরিসর হিসাবে। ইতিহাসের আশ্চর্য চলন, এ বছরের ভাষা দিবসে সেই সব শৈল্পিক প্রকাশ গৌণ হয়েছে; ভাষা-সাম্রাজ্যবাদ-প্রতিরোধী রাজনীতিই আবার মুখ্য প্রশ্ন। শুধুমাত্র বাংলাভাষী হওয়ার কারণে কী প্রবল রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে, সাম্প্রতিক অতীত তার সাক্ষী। তার প্রত্যক্ষ কারণ নিঃসন্দেহে গৈরিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বাস্তুতন্ত্রের মুসলমান-বিদ্বেষ— কিন্তু, বড় ছবিটি দেখতে সমর্থ হলে বোঝা সম্ভব হবে যে, হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান’এর রাজনৈতিক প্রকল্পের বিপ্রতীপে ধর্মনির্বিশেষে বাংলা ভাষা একটি বড় প্রতিরোধ। সে প্রতিরোধ যে সর্বদা রাজনৈতিক বিরোধাভাসে ব্যক্ত হয়েছে, তা নয়— কিন্তু, হিন্দির রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য বাংলায় এখনও তার প্রশ্নাতীত বিজয়পতাকা গাঁথতে পারেনি। বহু ক্ষেত্রেই বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুঁজি সেই আধিপত্যের পথ আটকেছে। উল্লেখ্য যে, সেই সংস্কৃতি সর্ব ক্ষেত্রে সাবর্ণ সংস্কৃতি নয়— বরং, লোকজ সংস্কৃতির প্রতিরোধ অনুক্ত হলেও বহু ক্ষেত্রেই দৃঢ়তর হয়েছে। কাজেই, হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রকল্পের সাফল্যের জন্য হিন্দি ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা যেহেতু বাংলার মাটিতে এখনও অনায়ত্ত, তাই বাংলার বিরুদ্ধে আক্রমণের পিছনে সেই কারণটিও অনস্বীকার্য। রামনবমীর অস্ত্র-মিছিল বা ডিজে-তাণ্ডবের হনুমানজয়ন্তী, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কোনও আয়ুধই যে বাংলার প্রতিরোধকে ভাঙতে অসমর্থ, সে কথা যত স্পষ্ট হয়েছে, বাংলা ভাষাভাষীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উৎপীড়নও ততই তীব্র হয়েছে— একে সম্পূর্ণ সমাপতন বলে উড়িয়ে দেওয়া মুশকিল।

একটি বহুপ্রচলিত বক্তব্য হল, বাংলা তার আর্থিক গুরুত্ব হারিয়েছে বলে বাংলা ভাষারও জোর চলে গিয়েছে। কথাটির মধ্যে কয়েক আনা সত্য আছে। কাজের ভাষা হিসাবে বাংলার দর এবং কদর নেই— উচ্চকোটির জন্য সে জায়গা ইংরেজির, আর পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য তা হিন্দি। কিন্তু, ভাষার জোর তো কেবলমাত্র অর্থনৈতিক কারণেই নয়, তার প্রধান গুরুত্ব সংযোগের মাধ্যম হিসাবে। এবং, সেই নিরিখে বাংলার গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে, এমন দাবি করার কোনও অবকাশ নেই। ভাষার ভিত্তি যে আসলে দুর্বল নয়, এই কথাটি জনমানসে প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে কোনও লড়াইয়ের মতোই ভাষার লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও ন্যারেটিভ বা বয়ানের তাৎপর্য প্রভূত। বাংলা ইতিমধ্যেই হেরে গিয়েছে, এই বিশ্বাসটি মানুষের মনে গেঁথে দিতে পারলে প্রকৃত পক্ষেই বাংলাকে হারানো সহজতর হবে। উল্টো দিকে, ভাষার জোর সম্বন্ধে ভরসা থাকলে তার হয়ে লড়াইও জোরদার হতে পারে।

বিবিধ ঐতিহাসিক কারণে বাংলা ভাষার উপরে মধ্যবিত্ত সাবর্ণ সংস্কৃতির দাপট বিপুল। ফলে, সেই ‘এলিট’ বৃত্তের বাইরে থাকা ভাষা-সংস্কৃতিকে গৌণ করে রাখার ঘটনাটি বাংলা ভাষার নিজস্ব রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এ বার এ কথা বুঝে নেওয়ার সময় হয়েছে যে, সেই সাবর্ণ-উন্নাসিকতায় বাংলা ভাষার যদি ছিটেফোঁটা উপকার হয়ে থাকেও, বাঙালি জাতিসত্তার রাজনীতির বিপুল ক্ষতি হয়েছে। আজ বাং‌লা ভাষা ও বাঙালি একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে— ভাষা-পরিচিতির কারণে এমন সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার বাঙালি ইতিপূর্বে কখনও হয়নি। কাজেই, এই মুহূর্তটি বাংলাভাষী হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, বাঙালিত্বের সংজ্ঞাকে প্রকৃতার্থে সর্বজনীন করে তোলার। বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন এ বার এক হতেই হবে। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার আর কোনও উপায়ান্তর নেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Mother Language Mother Tounge

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy