E-Paper

বৈষম্যবাদ

দলীয় সংঘাতের জেরে রোজগার প্রকল্প কিংবা আবাস নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ হলে তার ক্ষতি বহন করতে হয় দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষকেই।

শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৯

Sourced by the ABP

জনকল্যাণের প্রকল্পকে রাজনীতির খেলার ঘুঁটি করা তোলা হয়তো নতুন কিছু নয়, কিন্তু কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তাকে এক অভাবিত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। একশো দিনের কাজের প্রকল্প (মনরেগা) এবং আবাস যোজনা, এই দু’টি প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কেন্দ্রের বিশেষ বঞ্চনা সম্প্রতি স্পষ্ট হয়ে গেল সংসদে। লোকসভায় তৃণমূল সাংসদ মালা রায়ের একটি লিখিত প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক জানিয়েছে, বাইশটি রাজ্যের ৭৭টি জেলায় গত তিন বছরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সেই সব জায়গায় নজরদারির জন্য কেন্দ্রীয় দল পাঠানো হয়েছে। স্বভাবতই তৃণমূল সাংসদরা প্রশ্ন তুলেছেন, তা হলে শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্য অর্থ বরাদ্দ বন্ধ কেন? এ প্রশ্নটা দলীয় রাজনীতির বিতণ্ডায় সীমাবদ্ধ থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কেন্দ্রের ভূমিকা, উন্নয়নে সব নাগরিকের সমানাধিকার, এবং সর্বোপরি রাজনীতির কৌশলের সঙ্গে প্রশাসনিক নীতির সম্পর্ক, এমন অনেক বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে। আজ রাজনৈতিক বিরোধিতার জেরে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যা হচ্ছে, তা যে আগামী দিনে অপরাপর রাজ্যের সঙ্গে ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কী? দলীয় সংঘাতের জেরে রোজগার প্রকল্প কিংবা আবাস নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ হলে তার ক্ষতি বহন করতে হয় দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষকেই। সেই ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ কখনও পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না। সরকারি সহায়তা না-পেয়ে যাঁরা ঋণগ্রস্ত হয়ে বাড়ি তৈরিতে বাধ্য হলেন, মনরেগার কাজ না-পেয়ে যাঁরা কাজের খোঁজে ঘর ছাড়লেন, তাঁদের ক্ষতির পরিমাপ হয় না। কখনও হয়তো ধরা পড়বে উন্নয়নের সূচকে।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, উন্নয়নের টাকা নিয়ন্ত্রণ করে বিরোধীর প্রতি জনসমর্থন খর্ব করার একটা চেষ্টা প্রশাসনের সব স্তরেই ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে দেখা যায়। রাজ্য সরকার বিরোধী জেলাগুলির বরাদ্দে নানা কার্পণ্য করে, পঞ্চায়েতগুলি বিরোধী সংসদে রাস্তা নির্মাণ, টিউবওয়েল সারানোর জন্য টাকা সহজে অনুমোদন করতে চায় না। ফলে উন্নয়নের নিরিখে এগিয়ে থাকা এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের একটা মানচিত্র তৈরি হয়। উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিভাজন দীর্ঘমেয়াদি হয়, কারণ প্রশাসনিক গুণমানেও ক্রমশ পিছোতে থাকে পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলি। অতএব কেন্দ্রের যুক্তি যদি হয় এই যে, বরাদ্দ খারিজ করে কাজ স্তব্ধ করে দেওয়ায় আখেরে লাভ হবে দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ জেলাগুলির, তা হলে বলতেই হয় যে তার সপক্ষে কোনও যুক্তি নেই, বরং বিপক্ষে দৃষ্টান্ত রয়েছে যথেষ্ট। ‘শাস্তি’ দেওয়া নয়, প্রয়োজন নজরদারি এবং খুঁটিনাটি সহায়তার।

প্রকল্পে ছেদ আনার ফলে কর্মহীনতা, গৃহহীনতা, দারিদ্রের প্রসার, এগুলিই আপত্তির একমাত্র কারণ নয়। সমস্যার শিকড় আরও গভীর। দলীয় রাজনীতি দিয়ে প্রশাসনের অভিমুখ নির্ধারিত হতেই পারে, কিন্তু প্রশাসনের যে কোনও সিদ্ধান্ত ও কাজকে থাকতে হবে সংবিধানের নির্দেশের মধ্যে। বিজেপি যে ভাবে প্রশাসনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য, ব্যক্তির অধিকারকে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করছে, যে ভাবে নির্বাচনী কৌশলকে প্রশাসনের নীতি করে তুলেছে, ভারতে তা অভূতপূর্ব। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, অসম, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান প্রভৃতি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মনরেগায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে নজরদারি দল যাচ্ছে, অথচ পশ্চিমবঙ্গে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-গ্রামীণে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা, দু’টি রাজ্যেই কেন্দ্রীয় দল গিয়েছিল। ওড়িশায় বরাদ্দ বন্ধ হয়নি, পশ্চিমবঙ্গে ২০২২-২৩’এর পর আর বরাদ্দ মেলেনি। এ যেন ভোটের আগে ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ তৈরির জন্য বিজেপির দলীয় প্রচারের উল্টো পিঠ। সাধারণ নাগরিক অবোধ, তাঁরা এ কাজের অমানবিক দিকটি বুঝবেন না— এটাই কি কেন্দ্রীয় শাসক দলের আশা?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

100 Days Work Indian Parliament

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy