সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দিল্লি যে ‘গ্যাস চেম্বার’-এ পরিণত হয়েছে, তা বহু-আলোচিত। এই ক্ষেত্রে এক সময় দিল্লির তৎকালীন শাসক দল আপ-এর ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছিল বিরোধী দল বিজেপি। সেই বিজেপি-ই গত বছর দিল্লির ক্ষমতা দখল করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদল দিল্লির হাওয়াবদলে অক্সিজেন জোগাতে পারেনি। তা একই রকম দূষিত, বিষাক্ত, শ্বাসরোধী থেকেছে এই শীতেও। আশ্চর্য হল, বিরোধীদের পাশাপাশি দিল্লির বায়ুদূষণ বিষয়ে তীব্র সমালোচনা সম্প্রতি শোনা গিয়েছে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর কণ্ঠেও। যোগী আদিত্যনাথ, যিনি কিনা আরএসএস-এর স্নেহধন্য এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যোগ্য উত্তরসূরি হিসাবে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত, সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ সরকারের প্রশংসা করেছেন উন্নয়নের প্রশ্নে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণের জন্য। সেই সূত্রেই তিনি তুলনা টেনেছেন ‘গ্যাস চেম্বার’ দিল্লির সঙ্গে। বলেছেন— দিল্লির অবস্থা দমবন্ধকর। চোখে সমস্যা, শ্বাস নিতে কষ্ট, প্রবীণ অসুস্থ এবং শিশুদের বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সেখানে।
একই সঙ্গে, গোরক্ষপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে যোগী সে শহরের ‘দূষণহীন পরিবেশ’-এর অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। এই উল্টো সুরের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আছে অবশ্যই। কিন্তু সেই বিতর্কে না গিয়ে বলা যায়, দিল্লি সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যগুলি প্রাসঙ্গিক। এই শীতে একাধিক বার সেখানে বায়ুদূষণ ‘অত্যন্ত খারাপ’-এর স্তরটি স্পর্শ করেছে। বেশ কিছু স্থানে একিউআই পৌঁছে গিয়েছিল ৫০০-র কাছে। বছরের শুরুতে সেখানকার বাতাসে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার চেয়ে ৭৩ গুণ বেশি। এই সঙ্কটজনক অবস্থার উত্তরে দিল্লির বিজেপি সরকার আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসাবে গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান-এর প্রয়োগ এবং কৃত্রিম ভাবে বৃষ্টি নামানোর মতো কিছু ব্যর্থ প্রচেষ্টার বাইরে কোনও দীর্ঘমেয়াদি সুচিন্তিত সমাধানের দিশা দেখাতে পারেনি।
কিন্তু দিল্লির বায়ুদূষণকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানানোর আগে যোগী আদিত্যনাথের প্রয়োজন ছিল উত্তরপ্রদেশের দূষণের দিকে তাকানো। গ্রেটার নয়ডা, গাজ়িয়াবাদ, কানপুর, হাপুর, মিরাট, এমনকি রাজধানী লখনউ-এর বাতাসের গুণমানও প্রতি বছর শীতে উদ্বেগজনক থাকে, এর বেশ কয়েকটি ভারতের সর্বাধিক দূষিত শহরের তকমাও পেয়েছে। অবশ্যই দিল্লি শীর্ষে, কিন্তু তার মানেই যে উত্তরপ্রদেশের শহরগুলি নিরাপদ— এমনটি নয়। বরং যোগী নিজের মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে জলদূষণের বিপদ নিয়ে ভাবতে পারেন। মহাকুম্ভ চলাকালীন প্রয়াগরাজে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গমস্থলে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় বিপজ্জনক ব্যাকটিরিয়ার উপস্থিতির প্রমাণ জাতীয় পরিবেশ আদালতের কাছে পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ। দেশে ‘নমামি গঙ্গে’-র মতো প্রকল্প চালু থাকা সত্ত্বেও গঙ্গায় অপরিশোধিত তরল বর্জ্য এবং শিল্পজাত আবর্জনা মেশায় উত্তরপ্রদেশ সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে একাধিক বার কাঠগড়ায় তুলেছে আদালত। অন্য দিকে, দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ এবং সমীক্ষা দেখিয়েছে, উত্তরপ্রদেশই ভারতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ভূগর্ভস্থ জল তুলে নেয়, যার ফলে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে জলসঙ্কট ক্রমশ মাত্রা ছাড়াচ্ছে। ‘আপনি আচরি ধর্ম’-এর পাঠটি যোগী আদিত্যনাথকে রপ্ত করতে হবে বইকি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)