E-Paper

অ-স্বাভাবিক নয়

শীর্ষ আদালতই কিছু কাল আগে ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ করেছিল।

শেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৯
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

ঋতুকালীন ছুটি আইনগত ভাবে বাধ্যতামূলক করা হলে দেশে মেয়েদের কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে— এমন মন্তব্য শোনা গেল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কণ্ঠে। ইতিপূর্বে জনৈক আইনজীবী সকলের জন্য ঋতুকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা হোক— এই মর্মে শীর্ষ আদালতের কাছে আবেদন জানান। উদাহরণ হিসাবে দেশেরই বিভিন্ন রাজ্যে প্রচলিত সরকারি নিয়ম এবং বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থার নীতি তুলে ধরেন। আবেদন ছিল, সব রাজ্যেই যেন ঋতুকালীন ছুটির আইন কার্যকর করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সর্বোচ্চ আদালত অভিমত স্পষ্ট করেছে এবং প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ আবেদনটি খারিজ করেছে। অর্থাৎ, মহিলাদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার দ্বন্দ্বে শীর্ষ আদালত দ্বিতীয়টির গুরুত্বকেই তুলে ধরেছে এবং এক জরুরি বিষয়ে আলোকপাতও করেছে— এই আইন তৈরি হলে ঋতুস্রাব, সর্বোপরি মহিলাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে শ্রমবাজারে এক নেতিবাচক ধারণা পোক্ত হবে।

এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গত, শীর্ষ আদালতই কিছু কাল আগে ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ করেছিল। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক করার সঙ্গে ঋতুকালীন ছুটি মঞ্জুর করাকে আইনগত ভাবে বাধ্যতামূলক রূপ দানের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য বর্তমান। পার্থক্যটি বোঝা যায় দেশে কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের যোগদানের চিত্রটি পর্যবেক্ষণ করলে। ‘পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৩-২৪’ অনুযায়ী, ভারতে মেয়েদের শ্রমশক্তিতে যোগদান সামগ্রিক বিচারে প্রায় ৪১% হলেও শহরে তা মাত্র ২৫%-এর কাছাকাছি। এবং বেতনভোগী মেয়েরা পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় প্রায় ২০% কম রোজগার করেন। এই বৈষম্য-চিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের নিয়োগে সামান্যতম ‘ঝুঁকি’ বৃদ্ধির আশঙ্কাও পুরুষদের পাল্লা ভারী করবে, যেখানে নিয়োগের ‘জটিলতা’ তুলনায় কম। তা ছাড়া, দেশের মহিলা শ্রমশক্তির বিরাট অংশ গৃহশ্রম, নির্মাণকার্য, কৃষিক্ষেত্রের মতো অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিয়োজিত, যেখানে যৎসামান্য অজুহাতে কর্মহীন হওয়ার উদাহরণ সুপ্রচুর। প্রতি মাসে ঋতুকালীন ছুটির সুবিধা তাঁরা কতটুকু পাবেন? ঠিক এই প্রশ্নই উঠেছে কর্নাটকে, যেখানে গত বছর আইন করে মাসে এক দিন মহিলা-কর্মীদের সবেতন ঋতুকালীন ছুটির নিয়ম চালু হয়েছিল।

ঋতুস্রাব প্রতি মাসে মেয়েদের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তা রোগ নয়, গর্ভসঞ্চারের মতো বিশেষ অবস্থাও নয়। ছুটির দাবি যাকে ঘিরে, সেই ঋতুকালীন অস্বাচ্ছন্দ্যও সকলের সমান নয়। বরং, যাঁদের ক্ষেত্রে অস্বাচ্ছন্দ্যের প্রকৃতিটি তীব্র ও কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী, তাঁদের উপযুক্ত চিকিৎসা আবশ্যক, কারণ সেটি বিশেষ কিছু অসুখের ইঙ্গিতবাহী। কিন্তু শতাংশের বিচারে সেই সংখ্যাটিও নিতান্ত কম। সামান্য সংখ্যকের অস্বাচ্ছন্দ্যকে বাকি বৃহৎ অংশের সঙ্গে আইনি পথে যুক্ত করা বাস্তবসম্মত কি? বরং যেখানে চিকিৎসা আছে, যন্ত্রণার উপশমের ব্যবস্থা আছে, সেখানে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট দিনে সবেতন ছুটির বন্দোবস্ত নারী-পুরুষের সমানাধিকারের দীর্ঘ লড়াইটিকে বেশ কয়েক ধাপ পিছিয়ে দিতে সক্ষম। শীর্ষ আদালতের বক্তব্যও যথার্থ ভাবেই সেই দিকে ইঙ্গিত করছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Supreme Court of India Menstrual Leave

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy