E-Paper

সক্রিয়তা জরুরি

২০১৩ সালের লোকায়ুক্ত আইনটির উদ্দেশ্য ছিল এটাই। এর মাধ্যমে রাজ্যস্তরে দুর্নীতি-বিরোধী একটি আইনি কাঠামো নির্মিত হয়।

শেষ আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬ ০৯:০৬

অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে নাগরিক পুলিশ-প্রশাসনের দ্বারস্থ হবেন, তাঁর অভিযোগ গৃহীত হবে এবং যথাযথ গুরুত্ব সহকারে তার নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে, প্রয়োজনে অন্যায়কারীর শাস্তি বিধান হবে— জনকল্যাণকামী সুপ্রশাসন এমন ভাবেই চলার কথা। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, এই দেশে প্রায়শই এমনটি হয় না। পশ্চিমবঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়। কাজ না হওয়ার কারণ কখনও রাজনৈতিক, কখনও প্রভাবশালী যোগ, কখনও নিছকই সদিচ্ছার অভাব। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রত্যাশা যে স্বতন্ত্র কোনও সংগঠন পূরণ করতে পারে, তার নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে লোকায়ুক্ত। পরিসংখ্যানে স্পষ্ট, গত এক বছরে লোকায়ুক্তের দফতরে জমা পড়া ৭৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫০টিরই নিষ্পত্তি হয়েছে। জানা গিয়েছে, প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই লোকায়ুক্তের দফতরে অভিযোগ জমা পড়া বা দফতর থেকে রিপোর্ট তলব করার পরেই নড়ে বসেছে প্রশাসন। যেমন— ভাড়া দেওয়া গ্যারাজকে অন্য কাজে ব্যবহার করা, শিশুকে যৌন নির্যাতনের মতো বিবিধ ক্ষেত্রে পুর-কমিশনার বা পুলিশ সময়মতো সক্রিয়তা দেখায়নি। ফলে, অভিযোগকারীকে লোকায়ুক্তের দফতরে যেতে হয়। লোকায়ুক্তের ঠেলায় সেই কাজই দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। সুবিচারের পথ প্রশস্ত হয়েছে।

২০১৩ সালের লোকায়ুক্ত আইনটির উদ্দেশ্য ছিল এটাই। এর মাধ্যমে রাজ্যস্তরে দুর্নীতি-বিরোধী একটি আইনি কাঠামো নির্মিত হয়। লোকায়ুক্তের কাজ হল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আমলা-সহ জনপরিসরে কর্মরতদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো অভিযোগগুলির স্বাধীন ভাবে তদন্ত করা। কর্নাটকে যেমন লোকায়ুক্তের রায়েই দুর্নীতির মামলায় জেল হয়েছিল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়েদুরাপ্পার। প্রসঙ্গত, শুধুমাত্র লোকায়ুক্ত নয়, ভারতে মানবাধিকার কমিশন, শিশু-অধিকার রক্ষা কমিশন, মহিলা কমিশন, তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্তদের অধিকার রক্ষার্থে গঠিত জাতীয় কমিশন— সবই গঠিত হয়েছিল এই উদ্দেশ্যে যে, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলিতে সরকারি আধিকারিক যদি নিজ কর্তব্য পালন না করেন, অথবা নিজের বা দফতরের দোষ ঢাকতে প্রকৃত অভিযোগকে এড়িয়ে যেতে চান, তবে কমিশনগুলির কাছে মানুষ সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন।

সমস্যা হল, এই কমিশনগুলি অনেক রাজ্যেই প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। যেমন, বিভিন্ন রাজ্যের তথ্য কমিশনগুলি প্রায় অকেজো হয়ে আইনের মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছে না। কেন্দ্র এবং রাজ্যের মানবাধিকার কমিশনগুলির অবস্থাও প্রায় অনুরূপ। খাতায়-কলমে কমিশনগুলি স্বতন্ত্র হলেও হামেশাই সরকার-ঘনিষ্ঠদের উচ্চপদে নিয়োগের কারণে কমিশনের কাজে সেই স্বাতন্ত্র্যের খোঁজ মেলে না। একদা সুপ্রিম কোর্ট এই কারণেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘নখদন্তহীন বাঘ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে বগটুই, সন্দেশখালি, এমনকি আর জি কর-কাণ্ডের ঘটনায় মহিলা কমিশনের যথাযথ ভূমিকা পালন না-করা সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, এই কমিশনগুলির কাজ শুধুমাত্র প্রতিবাদ জানানো, বা কিছু নির্দিষ্ট অভিযোগের নিষ্পত্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়, সরকারের বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রগুলিকে জনসমক্ষে আনাও তাদেরই দায়িত্ব। সুতরাং, গণতন্ত্রের স্বার্থেই কমিশনগুলিকে ঢেলে সাজানো একান্ত জরুরি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Human Rights Child Rights Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy