E-Paper

অথ আশা কুয়াশা

মার্কো রুবিয়ো বুদ্ধিমান কূটনীতিক, তিনি নিশ্চয় জানেন যে, ভারত কী ভাবে তার দিকে ধেয়ে আসা উপর্যুপরি অপমানকে দেখছে ও দেখবে, এবং তাঁর আশ্বাসবাণী গ্রহণ করবে, তা একান্ত ভাবে ভারতেরই বিবেচ্য।

শেষ আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬ ০৯:১১

চার দিনে কী না হয়। এক নিরাশার অন্ধকার থেকে আশার মরীচিকা জ্বালানো যায়, অনেক রকম প্রতিশ্রুতির ফোয়ারা ছুটিয়ে দেওয়া যায়, আত্মপ্রচারে ব্যগ্র এক ব্যর্থ সরকারকে কিছু খড়কুটো জোগান দেওয়া যায়। মে মাসের শেষে আমেরিকান বিদেশ সচিব মার্কো রুবিয়োর চার দিনের ভারত সফর এই ভাবেই পরিকল্পিত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নানা ভারতবিরোধী কিংবা ভারত-উদাসীন মন্তব্যে দিল্লিতে বিস্তর উদ্বেগবাষ্প জমেছে, তা আন্দাজ করেই এই সফরের প্রতিটি ঘণ্টা পরিকল্পিত হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, দুই দেশের সম্পর্করাস্তায় অসংখ্য খানাখন্দে পিচ ঢালার প্রয়াস। কূটনীতির ক্ষেত্রে সংযম ও বাক্‌চাতুর্য অত্যন্ত জরুরি দক্ষতা— ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টকালে যে দক্ষতার অভাব উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মেরামতি। কেবল ভারতের ক্ষেত্রেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য শক্তির ক্ষেত্রেও ট্রাম্প সরকারের বিদেশ দফতর নিশ্চয়ই এখন অভূতপূর্ব চাপের মধ্যে কাজ করছে। ভারতে এসে রুবিয়োর তাই প্রধান লক্ষ্য ছিল, এটা প্রমাণ করা যে আমেরিকা কেবল নিজের কথা ভেবেই বিশ্বমঞ্চে বিরাট শিশুর মতো খেলায় মত্ত নেই, অন্য সঙ্গীসাথিদের কথাও তার মাথায় আছে ঠিকই।

মার্কো রুবিয়ো বুদ্ধিমান কূটনীতিক, তিনি নিশ্চয় জানেন যে, ভারত কী ভাবে তার দিকে ধেয়ে আসা উপর্যুপরি অপমানকে দেখছে ও দেখবে, এবং তাঁর আশ্বাসবাণী গ্রহণ করবে, তা একান্ত ভাবে ভারতেরই বিবেচ্য। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ প্রসঙ্গে, বাণিজ্যশুল্ক প্রসঙ্গে, রুশ তেল কেনার স্বাধীনতা প্রসঙ্গে, ভারত গত কয়েক মাস ধরে একাধারে কেবল অসম্মান গলাধঃকরণ করে গিয়েছে। ফলে এখন যে বার্তাই হোক না কেন, ভারতকে সতর্ক বিচার করেই এগোতে হবে। আকস্মিক ভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার নতুন করে ‘আমি ভারতকে ভালবাসি, খুব ভালবাসি’, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী মোদীর বিরাট, বিরাট ভক্ত’ ইত্যাদি ধুয়োয় কেন অবগাহন করেছেন, দিল্লিকে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে। বুঝতে অসুবিধা নেই, ঠিক যে ভাবে বিচলিত শিশুকে ভোলানোর চেষ্টা হয়, ট্রাম্পের এই সব কথার মধ্যে তেমনই একটা মাথায় হাত বোলানোর ভাব বেশ স্পষ্ট, যাকে ভিন্ন ভাষায় ‘স্পর্ধা’ বলা যেতেই পারে। বাণিজ্য চুক্তি ইত্যাদির সদর্থক প্রতিশ্রুতির বয়ানের মধ্যে তাই ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক যদি শেষ অবধি কিছু চোরাগোপ্তা স্বার্থছুরিকাঘাত দেখে, অবাক হওয়ার কারণ নেই। আমেরিকা-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শ্রেষ্ঠ পর্বেও অবস্থানের অসমানতা স্পষ্টতই দৃশ্যমান থেকেছে। আর এখন, অপারেশন সিঁদুর-পরবর্তী পর্বে, এবং সাম্প্রতিক বাণিজ্যশুল্কনাট্য পর্বে, ভারতকে আমেরিকা যে ভাবে দেখছে তাতে কোনও সমকক্ষতার প্রশ্নই নেই, এমনকি অসমকক্ষ মিত্রতারও ছায়া অনুপস্থিত।

মুশকিল হল, কূটনৈতিক ভাবে দিল্লি এখন বিশ্বমঞ্চে যে পরিস্থিতিতে, তাতে তার দর কষাকষির কোনও ক্ষমতাই অবশিষ্ট থাকার কথা নয়। বিশেষ প্রণিধানযোগ্য, পাকিস্তানের তুলনায় ভারতের অবস্থানের অবনতি। ইরান আক্রমণের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূমিকার বিস্তর প্রশংসা শোনা গিয়েছে যুগপৎ ট্রাম্প ও রুবিয়োর মুখে। রুবিয়ো ভারতে এসে সরাসরি পাকিস্তানের প্রশংসা না করলেও ছেলেভুলানো ভঙ্গিতে বলেছেন যে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ‘স্ট্র্যাটেজিক’, আর পাকিস্তানের সঙ্গে ‘ট্যাকটিক্যাল’। নেহাত নির্বোধ ছাড়া সকলেই বুঝবেন যে, এর থেকে স্পষ্ট ভাবে ওয়াশিংটনের কাছে ইসলামাবাদের বিশেষ গুরুত্বটি স্বীকার করে নেওয়াই দিল্লির পক্ষে সম্মানজনক ছিল। প্রথমেই মাদার টেরিজ়ার কলকাতা দর্শন করার মধ্যেও খ্রিস্টান সংখ্যালঘু পরিস্থিতির উপর আমেরিকার নজর প্রকাশিত— নিশ্চয় তা দিল্লির নজর এড়ায়নি। ফলে রুবিয়োর সফর নিয়ে যাঁরা অত্যধিক উল্লসিত, তাঁদের কূটনৈতিক বোধবিবেচনা কালেদিনে আরও তীক্ষ্ণ হোক, এই আশাটুকুই এখানে থাকুক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Marco Rubio america

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy