গত ছয় দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম জলসঙ্কটে ভুগছে ইরান। দেশের প্রধান জলাধারগুলির জলসঞ্চয় তলানিতে এসে ঠেকেছে। এমনটা চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যে রাজধানী তেহরান আর বাসযোগ্য থাকবে না— সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান জানিয়ে দিয়েছেন— আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বৃষ্টি না হলে সরকার তেহরানে জল বণ্টনের ক্ষেত্রে কড়াকড়ির পথে হাঁটবে। যদিও সেই পদক্ষেপ এই সঙ্কট কাটাতে পারবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিজেও সন্দিহান। প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার শহর তেহরানের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখন ঘোর অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট বাসিন্দাদের তেহরান ছাড়ার সম্ভাবনার কথা শুনিয়ে রেখেছেন, জানিয়েছেন হয়তো রাজধানীটিকেই সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে পারস্য উপসাগরের কাছাকাছি, জলের সন্ধানে।
একটানা ছ’বছর খরায় পুড়ছে ইরান। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অতিক্রম করেছিল ৫০ ডিগ্রি। শরৎকালীন বৃষ্টিপাতও প্রায় হয়নি। ফলে ১৯টি বাঁধের জল একেবারে শুকিয়ে যাওয়ার মুখে। ইরানের মতো শুষ্ক আবহাওয়ার দেশে জল সরবরাহ ব্যবস্থা অনেকটাই বাঁধগুলির উপর নির্ভরশীল। অথচ, মোট ধারণ ক্ষমতার ৫ শতাংশ জলও সঞ্চিত নেই সেখানে। সঞ্চয় আবার কবে স্বাভাবিক স্তরে পৌঁছবে, কী ভাবে পৌঁছবে, উত্তর নেই। আগামী কয়েক দিনে এই ক্ষতি পূরণের মতো বৃষ্টির পূর্বাভাসও নেই। সুতরাং, খুব শীঘ্র জলের জন্য হাহাকার কমবে না। কৃত্রিম ভাবে বৃষ্টি নামিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলার ভাবনাটিও বাতিল করা হয়েছে, কারণ তার জন্য মেঘে যে পরিমাণ আর্দ্রতা থাকা দরকার, ইরানে তা-ও নেই। শুধু কম বৃষ্টি নয়, এই বিপর্যয় কয়েক দশকের উদাসীনতার পরিণাম। সঙ্কট চরমে পৌঁছনোর পর সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী দিনে জল সরবরাহের সময় ও পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার, যে সব গৃহস্থালি অতি মাত্রায় জল খরচ করে, তাদের শাস্তি প্রদানের। সেই কাজটি আগে কেন করা হয়নি, যেখানে পরিবেশবিদরা বহু আগেই জলসঙ্কট বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেছিলেন? তেহরানের শতাব্দীপ্রাচীন জল সরবরাহের পরিকাঠামোটি ক্রমশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় ছিদ্রের মধ্য দিয়ে প্রচুর জলের অপচয় ইতিমধ্যেই ঘটেছে। সে বিষয়েও কোনও কার্যকর ব্যবস্থা করা হয়নি। প্রয়োজনাতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ, অবৈধ ভাবে কূপ খনন, পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কৃষিব্যবস্থা— সবের সম্মিলিত ফল এই মারাত্মক সঙ্কট।
উষ্ণায়নের প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বের জন্য যে সাবধানবাণী বিশেষজ্ঞরা শুনিয়েছিলেন, ইরানে ঠিক তেমনটিই ঘটছে। ইউনিসেফ-এর হিসাব বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় সত্তর কোটি মানুষ জলসঙ্কটের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। ভারতে ইতিমধ্যেই বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদের বৃহৎ অংশ জলসঙ্কটের চেহারাটি প্রত্যক্ষ করেছে। আগামী দিনে তালিকায় যোগ হতে পারে কলকাতাও। ভূগর্ভস্থ জলের যথেচ্ছ ব্যবহার, জলদূষণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ না করা, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং অবশ্যই আবহাওয়ার পরিবর্তন তেহরানের মতোই পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে একাধিক শহরে। অপচয় রোধে কঠোর পদক্ষেপ, স্মার্ট মিটার বসানো, বৃষ্টির জল সংরক্ষণের মতো অতি জরুরি ব্যবস্থা থেকে এখনও দূরে কলকাতার মতো শহরগুলি। তেহরান তাদের এ বার অন্তত সজাগ করবে কি?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)