পশ্চিমবঙ্গের ভূপ্রকৃতিটি ভারী বৈচিত্রপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাজ্যের বিপদের গুরুত্বটিও সহজে অনুমেয়। হিমালয় এবং সুন্দরবন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের আঘাতে অতি বিপজ্জনক অবস্থায় দাঁড়িয়ে। সেই বিপদ শুধুমাত্র উত্তরের পাহাড় এবং দক্ষিণের দ্বীপভূমিকে স্পর্শ করেই থেমে থাকবে না। সাবধান হওয়ার সময় অতিক্রান্ত। এখন প্রয়োজন, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে পাখির চোখ ধরে তদনুযায়ী পরিকল্পনা কার্যকর করা। সেই কথা মাথায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার জলবায়ু-সম্পর্কিত প্রকল্পগুলির পালে জোরালো হাওয়া দেওয়ার কাজটি শুরু করেছে। অন্তত তেমন ইঙ্গিতই পাওয়া গেল বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আয়োজিত এক সাম্প্রতিক বৈঠকে, রাজ্যের ভূতপূর্ব অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের বক্তব্যে। উদাহরণ হিসাবে তিনি জানিয়েছেন, সুন্দরবনের গলদা চিংড়ির কথা। বিশ্বব্যাঙ্ক-সমর্থিত এক প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে মিষ্টি জল ধরে রাখার জন্য। রাজ্য সরকারের সাহায্যে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেয়েরা সেখানে গলদা চিংড়ির চাষ করছেন। তবে একই সঙ্গে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে যুঝার জন্য প্রয়োজনীয় কেন্দ্রীয় বরাদ্দের অভাবের অভিযোগও করেছেন তিনি।
সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় বাজেটেই উপেক্ষার ছবিটি স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন পরিবেশবান্ধব ট্রেকিং রুট খোলার কথা বলেছেন। অথচ, নাম নেই পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ের। উত্তর-পূর্ব ভারতের বৌদ্ধ সার্কিটের ক্ষেত্রেও বাদ পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা থেকেও বঞ্চিত পশ্চিমবঙ্গ। এই অবস্থা যেখানে, সেখানে আলাদা করে পরিবেশ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সাহায্য মিলবে, এমন আশা করা চলে না। অথচ, পরিবেশ একটি সামগ্রিক বিষয়। সেখানে শুধুমাত্র পর্যটন নয়, সংবেদনশীল অঞ্চলগুলির বাসিন্দাদের পরিবর্তিত জলবায়ুর হাত থেকে যথাযোগ্য সুরক্ষা প্রদান এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করার কাজটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দায়িত্ব শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নয়, কেন্দ্রীয় সরকারেরও। অথচ, সেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের কাছেই বিশ্ব ব্যাঙ্কের অনুমোদিত সুন্দরবন উন্নয়নের অর্থবরাদ্দ দীর্ঘ সময় আটকে থেকেছে। এই সচেতন উদাসীনতা ক্ষমাহীন অপরাধ।
পাশাপাশি প্রশ্ন তোলা জরুরি, পশ্চিমবঙ্গ সরকারও কি জলবায়ু স্বার্থে যথেষ্ট সক্রিয়? এক দিকে এই রাজ্যে ২.৬২ লক্ষের অধিক পরিবেশবান্ধব জ্বালানিচালিত পরিবহণ সরকারি খাতায় নাম তোলে, অন্য দিকে বাসমালিকদের পনেরো বছরের মেয়াদ পেরোনো গণপরিবহণ চালানোর দাবিকেও মেনে নেওয়া হয়। উত্তরের দার্জিলিং, কালিম্পঙের নির্মাণে পরিবেশবিধি লঙ্ঘন, উত্তরবঙ্গের মূল নদীগুলির এক লক্ষণীয় অংশ নোংরা নালায় পরিণত হওয়া কি পরিবেশ সচেতনতার পরিচায়ক? মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাঁচ লক্ষ পুকুর খননের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু খাস কলকাতার আশপাশের যে পুকুরগুলি নীরবে জমি মাফিয়াদের দখলে চলে গেল, পূর্ব কলকাতার জলাভূমি যে নির্বিচারে বেআইনি বহুতলের ঠিকানা হয়ে উঠল, তার হিসাব মিলবে কোথায়? জলবায়ু প্রকল্পে অক্সিজেন জোগাতে চাইলে আগে রাজ্যে পরিবেশ ধ্বংসকারী কাজকর্মগুলি বন্ধ করতে হবে। সে বিষয়ে রাজ্য সরকারের প্রস্তুতি এখনও চোখে পড়ল না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)