E-Paper

শুল্কচাপের সামনে

২০২৪-২৫ সালে ভারত আমেরিকায় ৮,০০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছিল, যা ভারতের মোট রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই বাজার হাতছাড়া হলে ভারতকে নতুন বাজার ধরতে হবেই।

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩৫

দিল্লি আর ওয়াশিংটন ডিসি-র কর্তারা এই মুহূর্তে যখন ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসছেন, তাঁদের মস্তকে যেন বজ্রাঘাতের ছায়া। আকস্মিক ভাবেই বিষম পরিস্থিতিতে পড়েছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। বাস্তবিক, এমন পরিস্থিতি বিশ্বকূটনীতিতে দুর্লভ, যেখানে দুই পক্ষেরই স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও কূটনীতি সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, রাশিয়া থেকে ভারত তেল কিনলে ভারতের উপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। এর পরই দুই দেশের সরকারের মধ্যে বিরাট সক্রিয়তা। এতেই ইঙ্গিত, কেবল দিল্লিই মুশকিলে পড়েনি, আমেরিকার কর্তারাও সচেষ্ট কোনও মীমাংসা-পথ আবিষ্কারে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ট্রাম্পের পরবর্তী ঘোষণা: ইরানের সঙ্গে যে যে দেশ বাণিজ্যলিপ্ত তাদের উপর অতঃপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হবে— তালিকায় আছে চিনও! ভারতের বিষয়ে ঘোষণাটি সমাজমাধ্যমে এলেও এখনও পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের তরফে এ বিষয়ে সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়নি। এও লক্ষণীয়, ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ও ভারতে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সার্জিয়ো গোর-এর ত্বরিত বৈঠকে আশার বাণীই ধ্বনিত হয়েছে। আমেরিকার বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োর সঙ্গেও ফোনে ভারতীয় বিদেশমন্ত্রীর আলাপ সদর্থক অভিমুখে গিয়েছে। ফলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, কোনও না কোনও ভাবে একটি সদর্থক পথ বার হবে, দুই দেশের বাণিজ্যস্বার্থ ও কূটনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে না।

বুঝতে অসুবিধা নেই, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণাটি কার্যে পরিণত হলে ভারতকে তা উভয়সঙ্কটে ফেলতে পারে। তখন সামনে সম্ভাব্য পথ থাকবে দু’টি— এক, আমেরিকার হুমকির সামনে মাথা নত করে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করা; এবং দুই, আমেরিকাকে অগ্রাহ্য করা। দ্বিতীয় পথে হাঁটার প্রত্যক্ষ পরিণতি, বৃহত্তম বাণিজ্যসঙ্গীর বাজারটিকে সম্পূর্ণ হারানো। ২০২৪-২৫ সালে ভারত আমেরিকায় ৮,০০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছিল, যা ভারতের মোট রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই বাজার হাতছাড়া হলে ভারতকে নতুন বাজার ধরতে হবেই। পরোক্ষ বিপদটি সেখানে। বিপাকে পড়া ভারতের উপরে সম্ভাব্য বাণিজ্যসঙ্গী দেশগুলি এমন শর্ত চাপাতে চাইবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ হলে অন্তত সাময়িক ভাবে টান পড়বে দেশের ডলারের ভান্ডারেও। সাম্প্রতিক কালে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক একাধিক বার ডলার বেচে টাকার দাম স্থিতিশীল করেছে। সেই পথটি বন্ধ হলে টাকার আরও পতন প্রায় নিশ্চিত, ফলে আমদানি মহার্ঘতর হবে, এবং দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতি ঘটবে।

অন্য দিকে, দিল্লি জানে ট্রাম্পের এই চাপের কাছে নতিস্বীকারের অর্থ কত ভয়ানক। তার সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক ফল বাদ দিলেও প্রত্যক্ষ প্রভাবগুলিই বিপজ্জনক। প্রথমত, অন্যান্য তেল রফতানিকারী দেশের তুলনায় রুশ তেলে ভারতের সাশ্রয় হয় গড়ে দশ শতাংশ। সেটি বন্ধ হয়ে গেলে তেল আমদানির খরচে ১১-১২ শতাংশ বৃদ্ধি হবে— যার ফলে হয় বাজারে তেলের দাম বাড়াতে হবে, নয়তো সরকারকে তেল পরিশোধনকারী সংস্থাগুলিকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হবে। দু’টি বিকল্পের একটিও কাম্য নয়। আমদানির খরচ বাড়লে স্বভাবতই টাকার সাপেক্ষে ডলারের দাম বাড়বে, যা প্রভাব ফেলবে সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির উপরে। পাশাপাশি, ভারতের আর্থিক ভবিষ্যৎ বিষয়ে সংশয় তৈরি হবে, বিদেশি পুঁজিও উদ্বিগ্ন হবে। ইতিমধ্যেই সেই পুঁজি ভারত ছাড়তে আরম্ভ করেছে, বিপদ আরও ঘনালে তা আরও গতিশীল হবে। সব মিলিয়ে ‘বিশ্বগুরু’ হিসাবে নিজের দুন্দুভি-বাদক নরেন্দ্র মোদী নিশ্চয় টের পাচ্ছেন যে, তাঁর ‘পরম মিত্র’ ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন এমন একটি সঙ্কটে, স্বাধীনতার পর বিগত আশি বছরের ইতিহাসে যার তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

India USA Trade Deal

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy