E-Paper

বিচারহীন

আইনের সামনে সমতা, সংবিধানের সম্মান— এই দুইয়ের প্রতি আস্থার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ হল বিনামূল্যে আইনি সহায়তা। তাকে কেবল নিয়মরক্ষায় পর্যবসিত করা চলে না।

শেষ আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ ০৫:২৭

ভারতের দরিদ্র, প্রান্তিক, অসুস্থ মানুষদের কাছে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পৌঁছচ্ছে না বলে এক বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনের অনেক বছর কেটে যাচ্ছে কারাগারে। এ কথা সুবিদিত যে ভারতে জেলবন্দিদের ৭০ শতাংশই বিচারাধীন বন্দি, যাঁরা কেবল মামলার নিষ্পত্তির দিনটির জন্য অপেক্ষা করছেন। এই বিপুল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বিনামূল্যে আইনি সহায়তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, তা মনে করিয়ে দিল একটি অসরকারি সংস্থার রিপোর্ট। পুণে এবং নাগপুরের দু’টি কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্মরত ওই সংস্থাটির পাঁচ বছরের (২০১৯-২৪) অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রস্তুত ওই রিপোর্ট অনুসারে, বিচারাধীন বন্দিদের ৪১ শতাংশের কোনও নির্দিষ্ট আইনজীবী নেই, যিনি মামলার দিন উপস্থিত থেকে তাঁর হয়ে লড়বেন। মামলা সংক্রান্ত কোনও কাগজপত্র নেই ৫১ শতাংশের কাছে। দেশের সব ক’টি কারাগারে সমীক্ষা করলে এই ছবি খুব ভিন্ন হবে কি? ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে বিচারাধীন বন্দি সমগ্র কারাবন্দিদের ৭৮ শতাংশ, যা ভারতে শীর্ষের দিকে। পশ্চিমবঙ্গের জেলগুলি তাদের ধারণক্ষমতার চাইতে অনেক বেশি বন্দি বহন করছে। অথচ, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা কার্যকর হলে এই পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো যেত। সম্প্রতি এই সঙ্কটের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিক্রম নাথ মনে করিয়েছেন, বিনামূল্যের পরিষেবা মানেই নিম্নমানের পরিষেবা, এমনটাই ধরে নেওয়া হচ্ছে। অথচ এর অর্থ অসহায় মানুষকে করুণা করা নয়, এ হল সংবিধানের সুরক্ষা। সংবিধানের ২১ এবং ৩৯ক ধারা বলে, দারিদ্র বা স্বল্পশিক্ষা হওয়ার জন্য কেউ সুবিচার থেকে বঞ্চিত হবে না। আইনের সামনে সমতা, সংবিধানের সম্মান— এই দুইয়ের প্রতি আস্থার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ হল বিনামূল্যে আইনি সহায়তা। তাকে কেবল নিয়মরক্ষায় পর্যবসিত করা চলে না।

বিচারাধীন বন্দিদের সামাজিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় তাঁদের পক্ষে সুবিচার পাওয়া কত কঠিন— এঁদের ৭৭ শতাংশ স্কুল সম্পূর্ণ করেননি, অধিকাংশই তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ। আরও মর্মান্তিক, ৭৭ শতাংশ বন্দির সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখে না পরিবার। অর্ধেকেরও বেশি বন্দির শারীরিক বা মানসিক বিশেষ চাহিদা রয়েছে। নিজের স্বাভাবিক, মুক্ত জীবন থেকে ছোট একটি কামরার বন্দিজীবন, উৎপীড়ন এবং ভীতিপ্রদর্শনের সংস্কৃতি, এ সবই মনোরোগের কারণ হয়ে ওঠে। এই সঙ্কটকে স্বীকার করে গত বছর কলকাতা হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল, কোনও ব্যক্তি জেলবন্দি হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মানসিক রোগ এ ভাবে প্রতিহত করা যায়, বলেছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি। তবে এর জন্য যত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষিত সমাজকর্মী বা নার্স প্রয়োজন, তা পাওয়া যাবে কী করে, সে প্রশ্ন তুলেছিল রাজ্য সরকার। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থা তৈরি যতই কঠিন হোক, মূল প্রশ্নটি তাতে সরে যায় না। বন্দির মানসিক অবস্থা যদি তাঁর সুবিচার পাওয়ার অন্তরায় হয়ে ওঠে, তবে তাঁর মানসিক সুস্থতা রাখার দায়ও বিচার বিভাগের।

বিচার মানে কেবল এজলাসে মামলা তোলা নয়। বিচারাধীন ব্যক্তির সহায়তা এবং তাঁর অধিকারের সুরক্ষা যে বিচারের এক প্রধান মাত্রা, এ কথাটি যেন বিস্মৃত হয়েছে সরকার। অসরকারি সংস্থাটির রিপোর্ট দেখিয়েছে, মাত্র ৮ শতাংশ বিচারাধীন বন্দি বিনামূল্যে আইনি সহায়তার সুযোগ নিচ্ছেন। বহু বন্দি জানেনই না যে এই পরিষেবা তাঁরা পেতে পারেন। অনেক বন্দি অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলে বিনামূল্যে আইনি সহায়তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। মুক্তির আশায় ঋণগ্রস্ত হয়েও নিজস্ব উকিল খোঁজেন। এই বিপন্ন মানুষগুলিকে যদি ন্যায় দিতে হয়, তা হলে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দানের ব্যবস্থাকে সক্ষম, তৎপর, দায়বদ্ধ করতে হবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Law correctional home

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy