বিরাট কর্মযজ্ঞ নয়, প্রয়োজন ছিল একটু মানবিক ভাবনার, কিছু সদর্থক পদক্ষেপের। তা হলেই বিশেষ ভাবে সক্ষমদের দৈনন্দিন যাপন আর একটু অনায়াস, আরও একটু আনন্দময় হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এখনও যে সেই পথে ভাবতে অভ্যস্ত নয়, প্রতি পদে তার প্রমাণ মেলে। যেমন মিলল কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলাতেও। কলকাতার গর্বের এই বইমেলায় এখনও বিশেষ ভাবে সক্ষমদের প্রতি সমানুভবতার ছোঁয়া যথেষ্ট পাওয়া গেল না। প্রায় প্রতি বছরই এই ত্রুটির জায়গাটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে, করণীয় কী তা স্পষ্ট করা হয়েছে। তবু এই বছরেও অশক্ত, বিশেষ ভাবে সক্ষমদের কাছে বইমেলায় চলাচল কষ্টসাধ্য অভিজ্ঞতা হয়েই রইল। হুইলচেয়ারে আসীনদের জন্য বইমেলাতে যে কোনও র্যাম্প নেই, সে কথা বলা যায় না। কিন্তু র্যাম্প পেরিয়ে দোকানে প্রবেশ করা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে কোল্যাপসিবল গেটের কারণে। অপ্রশস্ত স্টল, নড়বড়ে র্যাম্পের পাটাতন, হুইলচেয়ারে আসীনদের ব্যবহারযোগ্য পর্যাপ্ত শৌচালয়ের অভাব— তাঁদের অনায়াস, স্বাধীন চলাচলকে থমকে দিয়েছে বারে বারে। তবে কি ধরে নিতে হবে, একমাত্র সুস্বাস্থ্যের অধিকারী পাঠকরাই দীর্ঘ ক্ষণ বইমেলায় সময় কাটানো, ইচ্ছামতো বই দেখার সুযোগ পাবেন? ‘অন্য’দের তেমন ইচ্ছে বা প্রিয় লেখকের সান্নিধ্যের আকুলতাকে কি দমন করে রাখতে হবে, কারণ বইমেলা আজও, তাঁদের কথা যথেষ্ট পরিমাণে ভাবতে প্রস্তুত নয়?
সমস্যা শুধুমাত্র বইমেলার নয়, বইমেলার দায়িত্বপ্রাপ্তরা যে সমাজের প্রতিনিধি, সামগ্রিক ভাবে সেই সমাজের মানসিকতার। এই সমাজ সুস্থ, স্বাভাবিক-এর পূজারি। অনস্বীকার্য যে, পূর্বের তুলনায় মানসিক, শারীরিক প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি বেশ খানিক পাল্টেছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়, এবং তাতে সহানুভূতির ভাগটিই অধিক। তাঁদের চাহিদাগুলিকে সম্মান করা বা তাঁদেরও নিজেদের মতো করে ভাবার ক্ষেত্রটি এখনও অ-প্রস্তুত। দুর্ভাগ্য, প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকারগুলি সুরক্ষার দায়িত্ব যাঁদের হাতে, সেই প্রশাসনও একই ভাবনার শরিক। এ দেশেই ২০১৬ সালের প্রতিবন্ধীদের অধিকার সংক্রান্ত আইন তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন, সমানাধিকার রক্ষা, এবং বৈষম্য না-করার কথা বলে। এ-ও বলা হয়েছে, সমস্ত গণপরিষেবা, সুবিধা, গণভবনগুলি ব্যবহারের অধিকার তাঁরা যাতে পান, তার ব্যবস্থা করবে প্রশাসন। অথচ, বাস্তবে দেখা যায়, বিশেষ ভাবে সক্ষমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্বাস্থ্যবিমার প্রকল্পের আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হন। ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর প্রোমোশন অব এমপ্লয়মেন্ট’-এর রিপোর্ট বলে, শারীরিক কারণ দেখিয়ে বিমা সংস্থা তাঁদের প্রকল্প বিক্রি করতে চায় না। বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে আবাসিক ব্যবস্থায় পড়ুয়াপিছু মাসিক ১৬০০ টাকাও নিয়মিত মেলে না, বহু সরকারি স্কুলে স্পেশাল এডুকেটর-এর পদটি খালিই থেকে যায়। গণপরিবহণে তাঁদের অনায়াস যাতায়াতের বন্দোবস্তটুকুও কি করা গিয়েছে? তদুপরি, সম্প্রতি এসআইআর-এর শুনানিতে তাঁদের যন্ত্রণাময় হাজিরার চিত্র বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কেন এই মানুষগুলির জন্য কোনও পৃথক সম্মানজনক ব্যবস্থা করা গেল না, তার উত্তর মিলবে কি? এই কি তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার পালন? প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিকে বিশেষ ভাবে সক্ষম করে তোলাই যেখানে ঘোষিত উদ্দেশ্য, সেখানে বাধার পাহাড় তৈরি করে অক্ষম করে রাখার এই প্রবণতা এখনই বন্ধ হোক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)