অর্ধশতকের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলে অস্তিত্বসঙ্কট আশ্চর্য নয়। ৪৯তম কলকাতা বইমেলা হয়তো আবারও কিছু গভীর ও গম্ভীর অস্তিত্বমূলক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে পাঠক, লেখক, প্রকাশক ও আয়োজকদের। তার বাইরে যে সমাজ এখনও মুদ্রিত বইপাঠের জগৎ এবং বিশেষ ভাবে বাংলা বইপত্রের জগৎ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেন, তাঁদেরও। বইমেলার হইহই প্রতি বছরের মতোই মহানগর জুড়ে এক আনন্দমুখরতা নিয়ে আসে, যাতে শামিল হন রাজ্যের ও দেশের অন্যান্য অংশের উৎসাহীরাও। প্রতি বছরের মতোই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে, মেলার যে বিপুল লোকসমাগম, তার একটি বড় অংশ নিশ্চয় বই কেনা, নিদেনপক্ষে বই দেখার জন্যই। যদিও বইমেলার মধ্যে খাবারের স্টলের বিস্তৃত পরিসর নিয়ে আপত্তি বহুশ্রুত, পাশাপাশি বইয়ের স্টল আর অন্যবিধ স্টলের তুলনামূলক পরিসরের গবেষণাতেও বিস্তর হতাশা উদ্রেক হওয়া সম্ভব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে উল্টো প্রশ্নটিও সঙ্গত, আকার কবেই বা প্রকারের গুণমানের যথার্থ নির্ধারক হতে পেরেছে। বরং নানা আকর্ষণ থাকলে বইয়েরও আকর্ষণ কিছু মাত্রায় থাকবে, এমন একটি যুক্তিও দিতে পারেন প্রায়োগিক তাত্ত্বিকরা। ছিদ্রসন্ধানী সমালোচক খুঁতখুঁত করে বলবেন, ভিড়ের পরিমাণ আর বই কেনাবেচার পরিমাণের মধ্যে তুলনাটি মোটেই সন্তোষজনক নয়। বইমেলা যখন ব্যবসার বিষয়, তখন লভ্যাংশের মাত্রাই উদ্যোগের মানের পরিচায়ক হওয়া উচিত— এমন অন্যথা-সঙ্গত যুক্তিও তিনি দেবেন। তাঁকে পাল্টা মনে করানো যেতে পারে, কলিকালে কানামামাকেও যত্নআত্তি করা জরুরি, নতুবা তিনিও অচিরে নাগাল ফস্কে দেশান্তরি হতে পারেন।
সব মিলিয়ে বইমেলার হিসাবের খাতাটি লাভই দেখায়, তাই এ নিয়ে কাঁদাকাটি অনাবশ্যক। বইমেলা আসলে বই কেনা বই পড়ার উপরে অন্য কিছু, বইয়ের সঙ্গ করা— এই ভাবেই ভাবা ভাল। সমগ্র বিশ্ব জুড়েই পাঠাভ্যাসের জগতে বড় পরিবর্তন এসে গিয়েছে, টেলিভিশন, কম্পিউটার পেরিয়ে মোবাইল এখন বইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌলতে পড়ালেখাভাবা সব কিছুই নব আনন্দে মাতোয়ারা। আজ থেকে সাড়ে তিন দশক আগেই দ্য ডেথ অব রিডিং নামে একটি বই লেখা হয়ে গিয়েছিল, লেখক মিচেল স্টিফেনস তাতে বলেছিলেন কী ভাবে কোনও একটি-দু’টি প্রযুক্তি বা বিষয় নয়, আসলে একুশ শতকের দ্বারপ্রান্তে আসার আগেই মানুষের জীবনপ্রবাহ এমন গভীর ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল, যা পাঠের অভ্যাসকে ধ্বস্ত করে দিতে পেরেছিল। এ এক বিশ্বায়িত সঙ্কট, সভ্যতাগত সঙ্কট। আর তাই, একুশ শতকের তৃতীয় দশকের দ্বিতীয়ার্ধে দাঁড়িয়ে বাঙালির বইমেলায় কত বই কেনা হচ্ছে, আর কত বই পড়া হচ্ছে, এ সমস্ত প্রশ্ন বহুলাংশে অপ্রাসঙ্গিক, আলঙ্কারিক। যা গিয়েছে যাক, যেটুকু আছে থাক— এই হল চরৈবেতি-র মূল নীতি। তদপেক্ষা জরুরি হল, বাংলা ও অন্য ভাষার সমান্তরাল বিশ্বকে, ছাপা বই আর ই-বইয়ের সহযাত্রাকে প্রসন্ন স্বীকৃতি দিয়ে, তার গুরুত্বকে সম্মান দিয়ে বইমেলাকে কী ভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে আরও কার্যকর ও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, সে কথা ভাবা।
এ কথাও বিস্মৃত না-হওয়া ভাল যে, বই কেনা বা বইয়ের সঙ্গ করা মানেই কিন্তু বই পড়া নয়, কোনও কালেই তা ছিল না। স্টিফেন হকিং-এর আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম নাকি সমগ্র পৃথিবী জুড়ে বেস্টসেলার তালিকায় প্রথম ছিল বছরের পর বছর। ৩৫টি ভাষায় অনূদিত বইটির বিক্রি এক কোটিরও উপরে। কিন্তু এই বই আবার পরিচিত সর্বকালের সবচেয়ে না-পড়া বই হিসাবে। বাস্তবিক, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ‘হকিং সূচক’ বলে একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক মাত্রাও প্রচলিত হয়েছে, যা সূচিত করে কেনা ও পড়ার মধ্যেকার আনুপাতিক হিসাব। হ্যারি পটারের বই প্রথম প্রহরেই কেনার জন্য গোটা বিশ্বের রাত-জাগা লাইনের কথা স্মরণীয়। কিন্তু লাইনে দাঁড়ানো মানুষরাও কি বৃহদায়তন বইগুলি পড়ে ফেলেছিলেন? হ্যারি পটারের দীর্ঘকালীন জনপ্রিয়তার পিছনে কিন্তু বড় গুরুত্ব চলচ্চিত্রেরই। বাস্তবিক, এ সব প্রশ্নবাণে খামোকা বইসংস্কৃতিকে জর্জরিত করার দরকার নেই। বই পড়া শিল্পটি যে আসলে তন্ত্র-ঐতিহ্যমতে গুহ্যবিদ্যার গোত্রভুক্ত, যা সর্বজনের গন্তব্যও নয়, বোধগম্যও নয়, এই সত্য স্বীকার করে নেওয়া ভাল। বইপাঠের উপর বইবিক্রেতাদের ব্যবসা নির্ভর করে না, বই কেনার উপরেই করে। আশা করা যায়, বই-রচয়িতার সন্তোষ কোনও সংখ্যার উপর নির্ভর করে না, বিষয়াগ্রহী পাঠক সীমিত হলেও তাঁদের কাছে বিষয়টি আদরণীয় বা প্রয়োজনীয় হলেই তা পূর্ণ হয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)