E-Paper

অসম্পূর্ণ

বাজেট বক্তৃতায় যা আছে, তা যেমন দেখা প্রয়োজন, যা নেই, সে দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। অর্থমন্ত্রী যুবশক্তির কথা মাথায় রেখে যে বাজেট প্রস্তুত করেছেন বলে জানিয়েছেন, সে বাজেটে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য, এই দু’টি ক্ষেত্রের প্রতি অবহেলা প্রকট।

শেষ আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৯

বক্তৃতার একেবারে গোড়াতেই নির্মলা সীতারামন জানিয়ে দিলেন, এ বছরের বাজেটের দিক নির্ধারণ করেছে ‘যুবশক্তি’। অর্থাৎ, যুবকদের জন্য যা ভাল, এই বাজেট সে পথেই হাঁটবে। তার অন্যতম স্তম্ভ আর্থিক সংস্কার। সীতারামন জানালেন, গত বছর সরকার সাড়ে তিনশোরও বেশি সংস্কারমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে। তাঁর এই বাজেটে অবশ্য বড় মাপের কোনও সংস্কার-প্রস্তাব নেই। থাকার কারণও নেই— সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, বাজেটে ঘোষণা করার বস্তু নয়। সত্য বলতে, অতীতের তুলনায় বর্তমান বছরের বাজেটটি বহুলাংশে ‘ঘোষণা’র বোঝা থেকে মুক্ত। বাজেটের অভিমুখ স্পষ্ট করেছেন অর্থমন্ত্রী— এক দিকে আর্থিক সংস্কার, বাহ্যিক ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো নির্মাণ; অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল দোলাচলকে সামাল দিতে অভ্যন্তরীণ অর্থব্যবস্থার দিকে জোর দেওয়া। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের কথা ভাবলে এই নীতির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। একটি কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য: গত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বিহারের ঝুলি ভরে দিয়েছিলেন, সম্ভবত সে রাজ্যের নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই; এ দফায় কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ শূন্য। বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি অবধি একটি ট্রেন লাইন, ডানকুনি থেকে একটি পণ্য করিডর— এর বাইরে পশ্চিমবঙ্গের আলাদা কিছু জোটেনি। কেন, তার পৃথক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সম্ভব, কিন্তু বাজেটের এই অবস্থানটি তার সার্বিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ— আর্থিক উন্নতির পরিকাঠামো তৈরি করতে পারলে উন্নতি নিজে থেকেই হবে, তার জন্য আলাদা ভাবে টাকা ধরে দিতে হবে না। তবে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এসেই কেন এই সার্বিক নীতিটি এমন প্রবল হয়ে উঠল, সে প্রশ্ন পৃথক। সে উত্তরও অবশ্যই খুঁজতে হবে।

বাজেট বক্তৃতায় যা আছে, তা যেমন দেখা প্রয়োজন, যা নেই, সে দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। অর্থমন্ত্রী যুবশক্তির কথা মাথায় রেখে যে বাজেট প্রস্তুত করেছেন বলে জানিয়েছেন, সে বাজেটে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য, এই দু’টি ক্ষেত্রের প্রতি অবহেলা প্রকট। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খাতে ভারত বিনিয়োগ করবে, পরিষেবা ক্ষেত্রে জোর দেবে ইত্যাদি। কিন্তু, দেশের ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তির যদি গোড়ায় গন্ডগোল থাকে, অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষাতেই যদি ঘাটতি থাকে, তা হলে সেই উচ্চ মার্গের প্রশিক্ষণ তারা অর্জন করবে কী ভাবে? ভারতীয় পণ্যকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হতে হলে শ্রমের যে মাত্রার দক্ষতা প্রয়োজন, তা-ই বা অর্জন করার উপায় কী? এবং, শিশু-কিশোররা যদি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না হয়, যদি তাদের পুষ্টির অভাব থাকে, তা হলেই বা তারা ভবিষ্যতের মজবুত শ্রমশক্তি হয়ে উঠবে কী করে? সংস্কার ও পরিকাঠামো গঠনের যাবতীয় পরিকল্পনা অর্থহীন হয়ে যায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের এই অবহেলার কারণে। প্রবণতাটি নতুন নয়— কেন্দ্রীয় বাজেট ‘জনমুখী’ হলেও তাতে এ দু’টি ক্ষেত্র বঞ্চিত থাকে, এ বার ‘সংস্কারপন্থী’ বাজেটেও সেই অবহেলা অপরিবর্তিত।

দ্বিতীয় যে ক্ষেত্রটি এই বাজেটে অন্তত আংশিক ভাবে অবহেলিত, তা কর্মসংস্থান। অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন’-এর বিষয়টি। আজকের সমাজমাধ্যম-নির্ভর দুনিয়ায় সে পথে অনেকেই অর্থোপার্জন করছেন বটে, কিন্তু তাকে রোজগারের মূলধারার পথ হিসাবে ধরে নিলে মুশকিল। অর্থমন্ত্রী পর্যটন ক্ষেত্রে জোর দিয়েছেন। তাতে খানিক কর্মসংস্থান হতে পারে। কিন্তু, ভারত এখনও মূলত যে অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপরে নির্ভরশীল, তার উন্নয়নের কোনও রূপরেখা বাজেটে নেই। কৃষকের আয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু দিগ্‌নির্দেশ নেই। সরকার আইন করে মনরেগা তুলে দিয়ে পরিবর্তে ভিবি— জি রাম জি চালু করেছে, ফলে সে পথেও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা খানিক হ্রাস পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ অর্থব্যবস্থার চাহিদা বাড়বে কোন পথে, বাজেটে সেই প্রশ্নটির যথাযথ উত্তর পাওয়া গেল না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Nirmala Sitharaman Budget

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy