দু’টি উৎসব-অনুষ্ঠান এক দিনে পড়া বিরল নয়। মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন ও দুর্গাপূজার তিথি প্রায়ই মেলে, বসন্ত পঞ্চমীর লগ্নেই নেতাজির জন্মদিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস পড়েছে আগেও। এ বারও তাই। দু’টি অনুষ্ঠান এক দিনে পড়লে তার সমাধান কে স্থির করবেন? অনুমান অভ্রান্ত— রাজনৈতিক ‘দাদা’রা। যে-হেতু সে দিন নেতার কর্মসূচি থাকে, তিনি যা বলবেন সেটাই হবে। আর বিধানসভা ভোটের বছরে রাজনীতিবিদদের কাছে নেতাজির জন্মদিন, প্রজাতন্ত্র দিবসের তাৎপর্যই আলাদা। অতএব, তাঁদের নিদান, সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের এ দিন পুজোয় সেজেগুজে আনন্দ করতে যাওয়া মানা, স্কুলের পোশাকে উপস্থিত হতেই হবে নেতার অনুষ্ঠানে। উৎসবের আবহে বছরের একটি মাত্র দিনে, স্কুলে অন্য পোশাকে যাওয়ার ছাড়পত্র মেলে। সেই হইহুল্লোড়, খাওয়াদাওয়ার যৎসামান্য আনন্দের মানবিকতাটুকু রাজনৈতিক নির্দেশের কাছে চৃড়ান্ত অপ্রয়োজনীয়, অবহেলার বিষয়। ছাত্রছাত্রীরা বেঁকে বসলে, অভিভাবক আপত্তি তুললে, স্কুল কর্তৃপক্ষ অপারগতার বিষয়ে জানালেও সিদ্ধান্ত একটুও নত হয় না। রাজনৈতিক আদেশ যদি আসে যে উৎসব-আনন্দ তফাতে রাখতে হবে, তবে তা অবশ্যপালনীয়। বেআইনি নয়, হয়তো নিয়মনীতির খাতাবই মিলিয়ে দেখলে, অনৈতিকও নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্ষমতার খেলা। এমন খেলা, যার স্তরে স্তরে পুঞ্জীভূত অসংবেদনশীলতার শিক্ষা। যে কোনও সংস্কৃতি, উৎসব ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে দলীয় সুবিধার্থে পেষণ করার চক্র। এই রাজনৈতিক আদেশ-নির্দেশেরসঙ্গে যাঁরা এতটুকুও পরিচিত, তাঁরা জানেন কত অমোঘ এই দাদাতন্ত্রের নাগপাশ।
জবরদস্তির এই ছবি নতুন নয়। বঙ্গের সাধারণ মানুষের উপর এমন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বহু দিন ধরেই চলছে এবং এই প্রভাব গভীর। এখানে রাজনৈতিক নেতা বা দাদারা যা বলেন, যে পথ দর্শান, সেই পথে চলাই সমাজের পক্ষে নিরাপদ ও বাঞ্ছনীয়। এই দাদাতন্ত্রে আনুগত্য অভ্যাসের রূপে এতটাই সুপ্রোথিত তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও দেওয়া হয় না। দেখা গিয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এই রক্তচক্ষুর আওতা থেকে পরিত্রাণ পেতে দেওয়া হয় না। অথচ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির কাজই হল, বিদ্যার আলোকে চিন্তা করতে শেখানো, প্রশ্ন করার বোধ তৈরি করা। সেখানেই আজ ‘মেনে নেওয়া’ ও ‘মানিয়ে নেওয়া’-র চুপ-সংস্কৃতির তালিম দেওয়া হচ্ছে শৈশব থেকে। অতীত সহযোগিতার প্রসঙ্গ স্মরণ করিয়ে, শিক্ষককেও প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন হুমকি-সহকারে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে এ-ক্ষেত্রে ‘না’ বলার পরিণামে পরবর্তী ক্ষেত্রে কোনও প্রয়োজনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না-ও মিলতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল, শৈশব থেকেই একেবারে হাতেকলমে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নেতার কথায় ওঠবস করার, তাঁর নির্দেশ সর্বৈবভাবে মানতে শেখানো হচ্ছে। তৈরি করা হচ্ছে এমন এক সমাজ যারা মানতে অভ্যস্ত থাকবে নাগরিকের ব্যক্তিগত অনুভূতি, ইচ্ছার কোনও দাম নেই; জানবে যে জনজীবন, এমনকি শিশুজীবনও— রাজনীতিবিদের সম্পত্তি, প্রশ্নহীন আনুগত্যই হল শৃঙ্খলা এবং নীরব সম্মতিই হল করণীয়। আইন না ভেঙেও যে কতখানি দমন সম্ভব, এই ঘটনা তার প্রখর প্রমাণ। শ্রেণিকক্ষই প্রশ্ন তুলতে শেখায়, সেখান থেকেই প্রশ্ন তোলার সমূহ স্বাধীনতাকে বিনাশ করার এই অপকীর্তিগুলি ভবিষ্যৎ নাগরিক ও গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য— দুয়ের পক্ষেই অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)