E-Paper

বেদনার বর্ষপূর্তি

পহেলগামের জীবনযাত্রা দীর্ঘ কাল যাবৎ পর্যটনকেন্দ্রিক। এখানকার হোটেল, টাট্টু ঘোড়ার মালিক থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী— সকলেই পর্যটকদের এই মরসুমি প্রবাহের উপর নির্ভরশীল।

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩০

কিছু স্মৃতি চরম বেদনাদায়ক, দেশ ও দেশবাসীর মনে চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে দেয়। গত বছরের ২২ এপ্রিল দিনটি বদলে দিয়েছিল সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকাকে। ওই দিন আচমকাই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় পহেলগামের বৈসরন তৃণভূমির শান্ত পরিবেশ। সন্ত্রাসবাদী হামলায় হারিয়ে যায় ছাব্বিশ জন নিরপরাধ পর্যটকের প্রাণ এবং সেই সঙ্গে ভারতের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তা বোধও। বিবিধ কূটনৈতিক পদক্ষেপ-সহ এর কিছু দিনের মধ্যেই ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ওই হামলার কঠোর জবাব দেয় ভারত সরকার। বস্তুত, অপারেশন সিঁদুর দেশের সন্ত্রাসবিরোধী নীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য মতাদর্শগত পরিবর্তন আনে: এখন থেকে ভারতীয় ভূখণ্ডে বড় ধরনের কোনও হামলা হলে, ভারত এখন আর সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করবে না, বরং ভবিষ্যতের হামলা প্রতিরোধের জন্য পাকিস্তান ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোর উপর তাৎক্ষণিক ও দূরপাল্লার হামলা চালাবে। এক বছর অতিক্রান্ত, আজও সেই মর্মান্তিক ঘটনার ছায়া তাড়া করে ফেরে নিহতদের পরিবারকে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে সেই পরিবারগুলিও, যাদের জীবিকা কেড়ে নিয়েছে সেই দিনের সন্ত্রাস।

পহেলগামের জীবনযাত্রা দীর্ঘ কাল যাবৎ পর্যটনকেন্দ্রিক। এখানকার হোটেল, টাট্টু ঘোড়ার মালিক থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী— সকলেই পর্যটকদের এই মরসুমি প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত এপ্রিলের সন্ত্রাসবাদী ঘটনা অঞ্চলের সমগ্র অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। হামলার অব্যবহিত পরে পর্যটকদের কাশ্মীর ত্যাগের যে ঢল নেমেছিল, তা এখন এক স্থায়ী মন্দায় পরিণত হয়েছে। ভারতীয় পর্যটকদের এক বৃহৎ অংশই আজও কাশ্মীরে পর্যটন বিষয়ে সন্দিহান। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি আজ কঠিন সময়ের সম্মুখীন। সমস্যা রয়েছে আরও। ২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করে জম্মু ও কাশ্মীরকে যে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ এবং জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং, বহুল প্রচারিত একীকরণ এ পর্যন্ত সাধারণ কাশ্মীরিদের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগ বা রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়ে প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণেই বেশি রূপান্তরিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, পহেলগাম হামলার পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অংশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, বাজারের শালবিক্রেতা ও সাধারণ অভিবাসী কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে হেনস্থা, ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা তীব্র ভাবে বৃদ্ধি পায়। এই ধরনের তীব্র প্রতিক্রিয়া কেবল বিচ্ছিন্নতাবোধকেই গভীর করে না, একটি অভিন্ন জাতীয় কাঠামোর ধারণাকেও ক্ষুণ্ণ করে, যা ২০১৯-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য ছিল।

সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তাহীনতার ফল ভুগে চলেছেন উপত্যকার স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রশ্ন তোলা দরকার, অঞ্চলের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলি কি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী? তরুণদের কি পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে? কোনও রাজ্য বা অঞ্চলে একমাত্র নিরাপত্তাই স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। উন্নয়ন, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানও সমান ভূমিকা পালন করে। সর্বোপরি স্থানীয়দের বিশ্বাস অর্জন জরুরি। সেই পথে কি একটুও হাঁটা গিয়েছে? পহেলগামের বর্ষপূর্তি প্রশ্নগুলি নতুন করে এনে দিল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Pahalgam Kashmir

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy