E-Paper

জলশূন্য

জলের প্রাকৃতিক উৎসগুলি শুকিয়ে গেলে তা যেমন খাদ্য-নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তোলে, তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সঙ্কট, স্থানচ্যুতি এবং সামাজিক সংঘাতেরও সৃষ্টি করে।

শেষ আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২০
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

দেউলিয়া হতে চলেছে বিশ্ব। ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথ (ইউএনইউ-আইএনডব্লিউইএইচ) গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত তাদের রিপোর্টে ‘গ্লোবাল ওয়াটার ব্যাঙ্ক্রাপ্টসি’ শব্দটি ব্যবহার করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল পূর্বের চেয়েও অনেক বেশি নদী উপত্যকা, এবং জলের অন্য প্রাকৃতিক ভান্ডারগুলি তাদের অতীতের ‘স্বাভাবিক’ মাত্রায় ফেরার ক্ষমতাটি হারিয়ে ফেলবে। ভারতে গ্রীষ্মকাল আসন্ন। তার পরিপ্রেক্ষিতে সেই রিপোর্টকে আরও এক বার স্মরণ করা প্রয়োজন। কারণ, ভারতের বড় শহরগুলির মধ্যে এক বৃহৎ অংশ ইতিমধ্যেই তীব্র জলসঙ্কটের রূপটি কম-বেশি প্রত্যক্ষ করেছে। গত বছর পশ্চিম হায়দরাবাদে যে জলকষ্ট দেখা দিয়েছিল, তার মূলেও ছিল ভূগর্ভস্থ জলস্তরের দ্রুত নেমে যাওয়া, যে কারণটিকে বিশ্বের জল-দেউলিয়া হওয়ার পথে অন্যতম নির্ধারক হিসাবে তুলে ধরেছিল রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট।

জলের প্রাকৃতিক উৎসগুলি শুকিয়ে গেলে তা যেমন খাদ্য-নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তোলে, তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সঙ্কট, স্থানচ্যুতি এবং সামাজিক সংঘাতেরও সৃষ্টি করে। ভারতের মতো জাতপাতে দীর্ণ উন্নয়নশীল দেশে সঙ্কটের পরিমাপটি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সঙ্কট যত বাড়বে, কম রোজগার সম্পন্ন, গ্রামীণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে সহজে পরিস্রুত, নিরাপদ জলের জোগান পাওয়া ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর মধ্যে আবার বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মেয়েরা। ভারতের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে জলসঙ্কটের অভিঘাতটি নীরবে লিঙ্গবৈষম্যকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। গ্রামীণ ভারতের মেয়েদের কলসি মাথায়, বালতি হাতে জলের সন্ধানে পথ চলা কেবল সাহিত্যে, চিত্রে জায়গা করে নেয়নি, তা ঘোর বাস্তব। পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা দেখিয়েছিল, প্রায় ৭১ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারে পনেরো বছর বা তার বেশি বয়সের মেয়েদের উপরেই জল সংগ্রহের সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে। জলের সন্ধানে দিনের বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করা তাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসাবেই মনে করা হয়। পরিসংখ্যান দেখিয়েছিল, বছরে শুধুমাত্র জল সংগ্রহের কাজে এই মেয়েরা ব্যয় করে ২১০ ঘণ্টা।

এই অসুবিধা দূর করতেই ভারত সরকার দেশ জুড়ে পাইপলাইনে জল সরবরাহের উদ্যোগ করে, যাতে মেয়েদের বাইরে জল আনতে যাওয়ার পরিশ্রম কমে। সেই কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে কি? আর্থ-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সেই সুবিধা দেশের প্রত্যেক কোণের নাগরিকরা পাচ্ছেন কি? প্রশ্ন আরও আছে। সার্বিক ভাবে বিশ্বের সঙ্গে এই দেশও জল দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করলে পাইপলাইনের জল সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে কোন উপায়ে? বলা হয়েছে, জল দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে কঠোর ভাবে বেঁধে দিতে হবে জল ব্যবহারের পরিমাপ, বাঁচাতে হবে নদী, বিশেষ করে জলাভূমিগুলিকে, জল কম লাগবে— এমন বিকল্প কৃষির দিকে ঝুঁকতে হবে, এবং বর্জ্য জলকে পুনর্ব্যবহারের বিজ্ঞানসম্মত উপায় খুঁজতে হবে। রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণা এবং কাজে সেই সংক্রান্ত রূপরেখা নির্মাণের তৎপরতা যে এই বছরের গ্রীষ্ম শুরুর আগের সময়টিতেও দেখা গেল না, তা উদ্বেগের।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Water sources United Nations

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy