E-Paper

অপমান

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশনের সাম্প্রতিক আচরণে যে সুর ধরা পড়ছে, তা দুর্ভাগ্যজনক ভাবে নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি সাযুজ্যপূর্ণ শাসক দলের ভাষ্যের সঙ্গে।

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৯

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার প্রায়শই ভুলে যান, তিনি এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি। যে-হেতু দেননি, তাই তাঁর ভাষা, ভঙ্গি এবং প্রকাশ্য আচরণে সাংবিধানিক পদের মর্যাদা প্রতিফলিত হওয়াই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশনের সাম্প্রতিক আচরণে যে সুর ধরা পড়ছে, তা দুর্ভাগ্যজনক ভাবে নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি সাযুজ্যপূর্ণ শাসক দলের ভাষ্যের সঙ্গে। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের অব্যবহিত পরে কমিশনের সরকারি সমাজমাধ্যম হ্যান্ডেল থেকে সরাসরি সেই দলকে উদ্দেশ করে ‘স্ট্রেট টক’-এর ভাষায় পোস্ট— এবং তাতে কার্যত নির্বাচনী অনিয়মের আগাম ইঙ্গিত আরোপ— এই আচরণ শুধু অস্বাভাবিক বা অসৌজন্যপূর্ণ নয়, নজিরবিহীন। যদি নাগরিকের মনে এক মুহূর্তের জন্যও এই সংশয় জন্মায় যে, কমিশন আসলে শাসক দলের পোষা টিয়াপাখির মতো শেখানো বুলি উগরে দিচ্ছে, তবে তা ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে বড় দুঃসংবাদ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের প্রথম এবং প্রধান পরিচয় কোনও ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, সংবিধান-নির্ধারিত দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের কেন্দ্রে রয়েছে নিরপেক্ষতা। নির্বাচন কমিশনকে কেবল নিরপেক্ষ হলেই চলে না; জনমানসে সেই নিরপেক্ষতা নির্দ্বিধ, দ্ব্যর্থহীন ভাবে প্রতিষ্ঠাও করতে হয়। নতুবা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতাও হ্রাস পায়।

নির্বাচন কমিশনের টুইটে স্পষ্ট যে, শান্তি বজায় রাখার নামে নিরপেক্ষতা নামক আদর্শটি তাঁরা বিসর্জন দিতে চান। এর আগেও বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ প্রকাশ্য বাগ্‌বিনিময়, আপত্তিকর অসৌজন্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্বের প্রতি বার্তা, এবং সদ্য এক নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিককে অপসারণ ঘিরে বিতর্ক— এ সব কিছুকে আর ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে দেখা চলে না। ঘটনাগুলিকে একত্রে দেখলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোনও বিশেষ কারণে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার নিজেকে ক্ষমতার পরিসরটি অনায়াসে পেরিয়ে যেতে পারেন বলে ভাবছেন। প্রশ্নটি ব্যক্তিবিশেষের রূঢ়তা নিয়ে নয়; প্রশ্ন প্রতিষ্ঠানগত সংযমের। নির্বাচন একটি গুরুতর বিষয়, ফলে এই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত আবেগ, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা রাজনৈতিক লক্ষ্য দিয়ে চালানো যায় না। যে সব অভিযোগ উঠছে, তার ভিত্তিতে কমিশনের প্রথম কাজ প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান। তার পরিবর্তে প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সঙ্কটকে তীব্র করেছে। যে প্রতিষ্ঠানের সকল পক্ষের কাছে শেষ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেই প্রতিষ্ঠানই যদি বিতর্কের সক্রিয় শরিক হয়ে ওঠে, তবে গণতন্ত্রের জন্য তার অভিঘাত সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

মূল কথা, এক জন সাংসদ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র নন; তিনি জননির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার কার্যত নাগরিকের অবমাননা। অন্য দিকে, প্রশাসনিক পদ যত উচ্চই হোক, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক আধিকারিক শেষ পর্যন্ত ‘জনসেবক’। নির্বাচিত প্রতিনিধির প্রতি প্রকাশ্য অসম্মান এই কারণেই নাগরিকের গণতান্ত্রিক মর্যাদাকে পরোক্ষে খর্ব করে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু ভোটগ্রহণের শৃঙ্খলা বজায় রাখা নয়; তার সেই কাজের উপর নাগরিক আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা। যদি সেই আস্থার ভিত্তিতেই আঘাত লাগে, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া তার প্রকৃত মাহাত্ম্য হারায়। বিরোধীশাসিত রাজ্য হলেই যদি কমিশনের কার্যপদ্ধতির দরুন সেই আস্থায় আঘাত পড়ে, তা কোনও অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথচ লক্ষণীয়, এখন কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়, তামিলনাড়ুতেও মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন কমিশন ও কমিশন-প্রধান বিষয়ে একই আপত্তি তুলেছেন। সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনী পর্ব এনেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য অশুভ ইঙ্গিত।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gyanesh Kumar Election Commission of India West Bengal Politics West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy