E-Paper

যৌক্তিক সীমা

আদর্শ পরিস্থিতিতে যা ভাল, তাকেই এক অসম্ভব মাত্রায় বর্ধিত করলে তা কতখানি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ভোট-অন-অ্যাকাউন্ট তার সাক্ষাৎ প্রমাণ।

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৫

সামনেই নির্বাচন। ফলে পূর্ণাঙ্গ বাজেট নয়, ভোট-অন-অ্যাকাউন্ট পেশ করার কথা ছিল অর্থ দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় তিনি যা পেশ করলেন, প্রতিশ্রুতির বহরে তা পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ছাপিয়ে গিয়েছে— দুর্জনে বলবে, ওটা আসলে নির্বাচনী ইস্তাহার। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রকল্পের সংখ্যায় ‘সেঞ্চুরি’ হয়ে গেল। সব প্রকল্পের ব্যয়ের বোঝা সমান নয়, কাজেই মোট সংখ্যাটি কত, সে প্রশ্নের গুরুত্ব তুলনায় সামান্য কম। কিন্তু, যে সব খাতে খরচের বোঝা সত্যিই বিপুল, তার টাকা জোগাবে কে? লক্ষ্মীর ভান্ডারে ভাতার অঙ্ক বেড়েছে; তার সঙ্গে যুক্ত হল ‘যুব-সাথী’। কেন্দ্রীয় সরকার মনরেগা বাতিল করে দিয়েছে— তার জবাব দিতে রাজ্য খুলে ফেলল মহাত্মাশ্রী প্রকল্প। পাশাপাশি, মহার্ঘ ভাতা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেও রাজ্য সরকারের আশঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে— বার বার আদালতের দ্বারস্থ হয়ে মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার দিনটিকে পিছিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া এ বার বোধ হয় থামাতে হবে। এত টাকার ব্যবস্থা হবে কোথা থেকে, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য স্বভাবতই সে প্রশ্নের উত্তর দেননি। অর্থ দফতরের প্রধান উপদেষ্টা অমিত মিত্রও যা বলেছেন, তাতে এই প্রশ্নের কোনও সোজাসাপটা উত্তর নেই। বাজেট নথি থেকে পাওয়া হিসাবে দেখা যাচ্ছে, নতুন প্রকল্প ও ভাতা বৃদ্ধিতে রাজ্যের ব্যয় বাড়ল সম্ভাব্য আয়বৃদ্ধির চেয়ে বেশি। মূলধনি খাত ছাড়া আয়-ব্যয়ের হিসাবে ঘাটতি বিপুল। মূলধনি খাতে ঋণ মেটানোর খরচও বিপুল। সুতরাং, ভোটমুখী এই কল্পতরু ঘোষণাপত্রের বাস্তবায়নের জন্য আরও ধার করা ছাড়া রাজ্য সরকারের কাছে উপায়ান্তর আছে কি?

আদর্শ পরিস্থিতিতে যা ভাল, তাকেই এক অসম্ভব মাত্রায় বর্ধিত করলে তা কতখানি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ভোট-অন-অ্যাকাউন্ট তার সাক্ষাৎ প্রমাণ। দরিদ্র মানুষের জন্য নগদ হস্তান্তরের নীতি অর্থশাস্ত্রের কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ— লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের সুপ্রভাবের কথাও ইতিমধ্যেই আলোচিত। কিন্তু, নগদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোনও সরকার কতখানি খরচ করতে পারে, তার একটি যৌক্তিক ঊর্ধ্বসীমা রয়েছে— এবং, সেই সীমাটি নির্ধারিত হয় রাজ্যের আর্থিক ক্ষমতার মাপকাঠিতে। আর্থিক নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ দেশে বড়জোর মাঝারি স্তরের রাজ্য। সে রাজ্যে যত দূর যাওয়া সম্ভব, সরকার বহু পূর্বেই সে সীমা অতিক্রম করেছিল। ফলে, টান পড়েছে দীর্ঘমেয়াদি খরচগুলিতে। পরিকাঠামোয় অবহেলার ছাপ প্রকট; শিক্ষা-স্বাস্থ্যও বেহাল। অর্থাৎ, নাগরিকের জন্য হাতেগরম নগদের ব্যবস্থা করতে গিয়ে রাজ্য সরকার ক্ষতি করেছে রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের। এ বার এই ভাতা কার্যত সর্বজনীন হল— যুব-সাথী চালু করায় লিঙ্গের প্রশ্নও আর রইল না— ফলে দরিদ্রতম মানুষের জন্য ‘টার্গেটেড’ ভাতা প্রদানের সুনীতিটি পাকাপাকি ভাবে বিসর্জিত হল আদিগঙ্গায়। এই দায় বহন করবে, তেমন আর্থিক সাধ্য পশ্চিমবঙ্গের নেই। অতএব, ঋণই ভরসা।

স্বীকার্য যে, গৃহস্থের পক্ষে ঋণ যতখানি বিপজ্জনক, সরকারের ক্ষেত্রে তা নয়। কিন্তু, সরকার কেন ঋণ করছে, সে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি ঋণ করে মূলধনি খাতে ব্যয় করে, সম্পদ নির্মাণ করে, তবে সে ঋণ অবশ্যই ইতিবাচক— কারণ তা ভবিষ্যতে রাজ্যের আর্থিক অগ্রগতির পক্ষে সহায়ক হবে, এবং আয় বৃদ্ধি করবে। কিন্তু, ঋণ করে সে টাকা যদি আগের ঋণের সুদ মেটাতে খরচ করতে হয়, বা ভাতা দিতে ব্যয় করা হয়, তবে সে ঋণ নিতান্তই বোঝা। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সে বোঝা বাড়িয়ে চলেছে। রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ আয়ের অনুপাতে ঋণের পরিমাণ কত, সে হিসাব দিয়ে এই ভুলকে ঢাকা যাবে না। দরিদ্র মানুষের জন্য নগদ হস্তান্তরের প্রয়োজন এবং যাথার্থ্য অস্বীকার না করেও বলতে হয়, তার যৌক্তিক সীমা রাজ্য সরকার অতিক্রম করে গিয়েছে। এ বার থামা প্রয়োজন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Vote on Account Election

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy