সোমনাথ মন্দিরে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদী যদি জওহরলাল নেহরুর দিকে অভিযোগের আঙুল না তুলতেন, সেটাই ভারী আশ্চর্যের বিষয় হত। ১৯৫১ সালের মে মাসে যখন পুনর্নির্মিত মন্দিরের উদ্বোধন হয়, তখন সেই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের যোগদান বিষয়ে নেহরুর আপত্তিটি বহুচর্চিত। মোদী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ঘটনাটির অগ্রপশ্চাৎ অনুল্লিখিত রাখলেন। সত্য হল, নেহরু শুধু রাজেন্দ্র প্রসাদকে নিজের আপত্তির কথা জানাননি— তিনি এমন বিপুল ব্যয়ে মন্দির নির্মাণ বিষয়ে বলেছিলেন, যখন ভারতে নাগরিকের প্রাথমিক প্রয়োজনগুলি পূরণ করারও সাধ্যও রাষ্ট্রের নেই, তখন এমন অযথা ব্যয় ভাল দেখায় না; সৌরাষ্ট্র এই প্রকল্পে পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়ায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে আপত্তি জানিয়েছিলেন; জামসাহেব দিগ্বিজয়সিংজি বিদেশে ভারতীয় দূতাবাসগুলির কাছে সেখানকার নদীর জল এনে দেওয়ার অনুরোধ করলে নেহরু তা বারণ করে দেন; পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে জানান যে, আফগানিস্তান থেকে সোমনাথ মন্দিরের দরজা ফেরত আনার কোনও উদ্যোগ ভারত করছে না। নেহরু চেয়েছিলেন, এই অনুষ্ঠান যে কোনও ভাবেই রাষ্ট্রীয় নয়, সে কথা স্পষ্ট হোক। আপত্তির কারণটিও জানিয়েছিলেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়— ব্যক্তি হিসাবে যে কেউ যে কোনও অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পদে আসীন ব্যক্তি কেবল ব্যক্তিবিশেষ নন, রাষ্ট্রের অবস্থানের প্রতিনিধি। ভারতের প্রথম নাগরিক যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেন, তবে তা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি ভারতের দায়বদ্ধতা বিষয়ে বিশ্বমঞ্চে ভুল বার্তা প্রেরণ করবে।
সংবিধানের পাতায় ভারত এখনও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রই— কিন্তু সেই রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের হোতা হন, গৈরিক বস্ত্র পরিধান করে মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়ান, এবং অবশ্যই ক্যামেরার সামনে আসেন, যাতে সেই ছবি প্রত্যেক ভোটারের হাতে ধরা মোবাইল ফোনের মধ্য দিয়ে মরমে প্রবেশ করতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে বিশেষত সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা এখন দূরতর কষ্টকল্পনারও অতীত— সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মই এখন ভারতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রের মূল পণ্য। যে রাজনীতি নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থে দেশভাগের বেদনাবহ স্মৃতি উস্কে দিতে দ্বিধা করে না, তার পক্ষে বোঝা মুশকিল যে, সদ্য স্বাধীন দ্বিখণ্ডিত দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তার বোধ দিতে কতখানি সচেতন ছিলেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ইসলামি পাকিস্তানকে ছেড়ে যে মুসলমানরা ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে নিজেদের দেশ হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মাচরণে রাষ্ট্রকে জড়িয়ে ফেললে যে তাঁদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হত, এই কথাটির গুরুত্ব বোঝার জন্য যে মন প্রয়োজন, দুর্ভাগ্যক্রমে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির তা তখনও ছিল না, আজও নেই।
নেহরুর স্পষ্ট আপত্তি সত্ত্বেও রাজেন্দ্র প্রসাদ সোমনাথ মন্দিরের উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ ও নেহরু-জীবনীকার সর্বপল্লী গোপালের মতে, রাজেন্দ্র প্রসাদ ‘মধ্যযুগীয় মানসিকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ’। তবে, প্রসাদ কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শটিকে অস্বীকার করেননি। নেহরুর কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ছিল সব ধর্মের থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখা; প্রসাদ তাকে দেখেছিলেন সমান ভাবে সব ধর্মের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়াকে। সোমনাথ মন্দিরে তাঁর ভাষণেও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন সব ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতার কথা— বলেছিলেন, মন্দিরের পুনর্নির্মাণ কিন্তু পুরনো ক্ষতকে খুঁচিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে নয়। নরেন্দ্র মোদী হয়তো জেনে আশ্চর্য হবেন, নেহরুর প্রতিস্পর্ধী হিসাবে এই উপলক্ষে যে রাজেন্দ্র প্রসাদকে তাঁরা কাছে টানতে চান, তিনিও তাঁদের এই ঘৃণার রাজনীতির সমর্থক ছিলেন না। ভারত নামক দেশটির যে ছবি তাঁর হৃদয়ে ছিল, তা নেহরুর ভারতের চেয়ে যতখানি দূরে, মোদীর ভারতের চেয়ে তার ঢের বেশি দূরে অবস্থিত।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)