E-Paper

শৃঙ্গজয়

ক্রিকেটীয় জয়ের ক্ষেত্রে খেলার মাঠের ‘পারফরম্যান্স’-এর বিবেচনাই কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরের এই প্রথম রঞ্জি ট্রফি জয়কে শুধু সেই নিক্তিতেই মাপলে তার গুরুত্ব পুরোটা বোঝা যাবে না।

শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ ০৬:৩৬

বিশ্বকাপ জয় উদ্‌যাপনীয়, নিশ্চয়ই। তবে ভারতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের পর পর দু’বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বিজয় ঘিরে কলরোল থিতিয়ে এলে অন্তত সাম্প্রতিক আর এক জয়ের দিকে একটু মন দেওয়া যেতে পারে: জম্মু ও কাশ্মীরের প্রথম রঞ্জি ট্রফি জয়। এ-ও এক ‘ইতিহাস’ গড়া। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় এই মরসুমে সেরার শিরোপা জম্মু ও কাশ্মীর এই প্রথম অর্জন করল বলেই নয় শুধু, যে ভাবে তারা জয়ী হল সেই আরোহণ লক্ষ করার মতো। সাত বারের রঞ্জি চ্যাম্পিয়ন দিল্লিকে হারিয়ে তারা নকআউট স্তরে উঠেছে, প্রাক্তন চ্যাম্পিয়ন মধ্যপ্রদেশকে হারিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে, বাংলাকে সেমিফাইনালে, এবং ফাইনালে আট বারের রঞ্জি চ্যাম্পিয়ন কর্নাটককে! কে এল রাহুল, প্রসিধ কৃষ্ণ, করুণ নায়ার, ময়াঙ্ক আগরওয়ালের মতো আন্তর্জাতিক স্তরে খেলে আসা ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে পরস ডোগরা, কামরান ইকবাল, সাহিল লোতরা, আকিব নবিদের লড়াইয়ের জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। এই জয় তাঁদের প্রাপ্য ছিল— নিঃসন্দেহে।

ক্রিকেটীয় জয়ের ক্ষেত্রে খেলার মাঠের ‘পারফরম্যান্স’-এর বিবেচনাই কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরের এই প্রথম রঞ্জি ট্রফি জয়কে শুধু সেই নিক্তিতেই মাপলে তার গুরুত্ব পুরোটা বোঝা যাবে না। বিশ্ব ক্রিকেটে আফগানিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলের উত্থান যেমন রূপকথার মতো, জম্মু ও কাশ্মীরের এই আরোহণও তেমনই— এই দু’টি ভূখণ্ডের মানুষই দীর্ঘ যুদ্ধ বা যুদ্ধ-পরিস্থিতি, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, সন্ত্রাস, সামরিক-রাজনৈতিক সংঘাতের শিকার ও সাক্ষী। জীবন যেখানে অবরুদ্ধ ও সঙ্কটময়, খেলার স্বপ্ন সেখানে বিলাসিতা। তাই ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে অন্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি যেখানে যথেষ্ট সময়, শ্রম, অর্থ, পরিকাঠামো জুগিয়ে নিয়মিত আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের ক্রিকেটার তুলে আনার দিকে মন দিতে পেরেছে, জম্মু ও কাশ্মীর সেখানে ক্রীড়া-মানচিত্রে রয়ে গেছে উপেক্ষিত ও ব্রাত্য, বাকি ভারতবাসীর কাছে পর্যটন ও সন্ত্রাস প্রসঙ্গেই আলোচিত শুধু, ক্রীড়াসূত্রে কখনও নয়। তা সত্ত্বেও গত দশ বছরে তারা একাধিক বার রঞ্জি ট্রফিতে নজর কেড়েছে: তিন বার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে, কেরলের বিরুদ্ধে গত বছর প্রথম ইনিংসে মাত্র ১ রান কম থাকায় সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাবে ও ক্রীড়া প্রশাসনের মনোযোগে ভারতীয় ক্রিকেটের স্নায়ুকেন্দ্র হয়ে উঠেছে, তাদের পাশে ঘরোয়া ক্রিকেটে ‘অখ্যাত’ জম্মু ও কাশ্মীরের এই তুঙ্গস্পর্শ বুঝিয়ে দেয়, সেখানেও প্রতিভার কোনও অভাব নেই।

তবে শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না। তাকে খুঁজে বার করে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণে শাণিত করে মাঠে নামালে তবেই জয় আসে। গত পনেরো বছরে বিষেণ সিংহ বেদি, ইরফান পঠান প্রমুখের কোচ ও মেন্টর হিসেবে ভূমিকা জম্মু ও কাশ্মীরকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে, তুলে এনেছে পারভেজ রসুল-আবদুল সামাদ-উমরান মালিকের মতো ক্রিকেট-প্রতিভা। বিসিসিআই-এর বর্তমান সভাপতি মিঠুন মানহাসের সক্রিয় হস্তক্ষেপে জম্মু ও কাশ্মীর পেয়েছে অজয় শর্মার মতো কোচ, আধুনিক প্রশিক্ষণ-পরিকাঠামো। এই সব কিছুর ফল তাদের প্রথম রঞ্জি জয়। সদিচ্ছা ও সক্রিয়তা হাত ধরলে যে অনাদৃত খেলার মাঠেও সাফল্য আসে, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Jammu and Kashmir Ranji Trophy 2025-26

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy