কাকে ভোট দেবেন আপনারা, সেটা কথা নয়, আসল কথা— আপনারা প্রত্যেকে ভোট দিন!”— ১৯৫১-৫২ সালে ভারত নামক সদ্যোজাত দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দেশের কোণে কোণে ঘুরে ভারতবাসীর কাছে এই বার্তা প্রচার করেছিলেন। অতি জনবহুল, অতি দরিদ্র, সদ্য-স্বাধীনতাপ্রাপ্ত, নাগরিকত্বের অর্থ না-জানা দেশটি যে সেই সময়ে সমস্ত মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক অধিকার পৌঁছে দিতে পারবে, এমন আশা করা ছিল সুকঠিন। তবু প্রথম প্রধানমন্ত্রীর অত্যুৎসাহে, এবং পরিশ্রমে তা সম্ভব হয়েছিল। ভারতবাসী মাত্রেই ভোটার হিসাবে নিজেদের নতুন পরিচয় তৈরি করেছিলেন। তার পর থেকে বহু কষ্টক্লেশ দারিদ্রবঞ্চনা সত্ত্বেও ভোটাধিকার যে একটি বিশেষ সম্পদ, সম্মান ও গৌরবের বিষয়, রাষ্ট্রের কাছে অন্তত ওই ভোটের দিনগুলিতে যে তাঁরা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়— সে কথা ভারতবাসী মনে রেখে উদ্দীপ্ত বোধ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর পর্ব সমাপ্ত হওয়ার ক্ষণে ৯১ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটা যাওয়ায় নেহরুর ওই বার্তা স্মরণপথে উদিত হতে পারে। কেননা এর মধ্যে এক বড় অংশ নাম বাদ পড়ারই কথা থাকলেও অন্তত সাতাশ লক্ষ নাম নিয়ে ‘বিবেচনা’ এখনও বাকি, তবু এ বারের ভোটার তালিকা থেকে সেগুলি বাতিল হল। গণতন্ত্র হিসাবে ভারতকে আজ ব্যর্থ বলা চলে, কেননা মানুষকে রাষ্ট্রের নাগরিক ও ভোটার করে তোলার কাজটি রাষ্ট্রেরই হওয়ার কথা ছিল। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর পর্ব ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি ঘোর ব্যর্থতা ও হতাশার দ্যোতক।
এই সাতাশ লক্ষের সবাই নিশ্চয়ই বৈধ ভোটার নন। কিন্তু এই সাতাশ লক্ষের সবাই যে অবৈধ ভোটারও নন— সে কথা নির্বাচন কমিশন ও বিচারবিভাগের ট্রাইবুনাল ব্যবস্থাতেই স্বীকৃত। অর্থাৎ কেবল পদ্ধতিগত ও সময়গত সমস্যায় সকলের ভোটাধিকার বিবেচনা চূড়ান্ত হল না। অথচ, নির্বাচন কমিশনের শুনানি থেকে বিচারপতিদের ‘বিচার’প্রক্রিয়া, এবং তার পর ট্রাইবুনালের পুনর্বিচার, ইত্যাকার চক্রবৎ যে পরীক্ষানিরীক্ষা চলেছে, তা সন্তোষজনক ভাবে শেষ করার দায়িত্বটি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর, তথা কেন্দ্রীয় শাসকের উপর। ফলে দায়িত্বের স্খলনের সামগ্রিক নৈতিক ভারও তাঁদেরই। এই স্খলনের প্রকৃত কারণ যে-হেতু অত্যধিক তাড়াহুড়া, নির্বাচন শুরু হওয়ার আগে কোনও ক্রমে কাজ শেষ দেখানোর দুর্দান্ত অভিলাষ— সেই কারণে দায়টি আরওই শাসকের উপর বর্তায়। উত্তরপ্রদেশে পরবর্তী নির্বাচন কিছু সময় দূরে বলে সেখানে তুলনায় ধীরেসুস্থে এসআইআর-এর কাজ হচ্ছে, প্রথম দফায় বাতিল ভোটারের জন্য বিবেচনার সময় পাওয়া যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হল কেবল শাসকের ইচ্ছায়। প্রশ্ন উঠছেই, বিরোধীশাসিত রাজ্য না-হলে এই অস্বাভাবিক তাড়া দেখানো হত কি?
প্রশ্ন আরও। সর্বোচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে আশ্বাস এসেছে, ভোটার তালিকা থেকে এই বার নাম বাদ গেলেও পরবর্তী কালে তা ফিরে আসতে পারে। বিচারবিভাগের উপর সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও সংশয় প্রকাশ করতে হয়, ভোটারের ভোটাধিকার কখন থাকবে, আর কখন নয়, তা কি তবে রাষ্ট্রের মর্জি ও ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল? এই কি গণতন্ত্রের প্রকৃত অভিজ্ঞান? বিশেষত মহিলা ও সংখ্যালঘুরা যখন এই অধিকার-হনন যজ্ঞের প্রধান বলি, প্রশ্নটি কি সেই সূত্রে আরওই তীব্র হয়ে ওঠে না? কেন্দ্র থেকে প্রান্তে অধিকার পৌঁছে দিতে যে সব রাষ্ট্র নারাজ বা অপারগ, তার থেকেও পিছিয়ে গেল আজকের ভারত— প্রান্তের এতদিনকার প্রদত্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে। রাজ্যের তাবৎ শুভবোধসম্পন্ন নাগরিক যে আশ্বাসটিকে আঁকড়ে ছিলেন যে ভোটাধিকার-হৃত বৈধ ভোটারদের ফিরিয়ে আনা যাবে, তাঁদের আস্থা ও বিশ্বাসকে ধ্বস্ত করে সংঘটিত হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৬।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)