E-Paper

বিশ্বাসের মূল্য

কাকে বিশ্বাস করা চলে, কে ভরসার যোগ্য, এ প্রশ্নটা অতএব বার বার ফিরে এসেছে রাজনীতির নানা সন্দর্ভে।

শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪৬

যাকে বিশ্বাস করলাম, সে যদি বিশ্বাসের মর্যাদা না রাখে, তা হলে আমরা কী নিয়ে আছি অমল? সারাটা জীবন কী নিয়ে থাকব? ট্রাস্ট, ফেথ, এ সব কি তা হলে ভুল?” চারুলতা ছবিতে এ কথাগুলি বলেছিল কাগজ-সম্পাদক ভূপতি। রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মিত এই ছবিতে ভগিনীপতি তথা বন্ধুর দ্বারা প্রতারিত ভূপতি প্রশ্ন করেছিল, বিশ্বাস না থাকলে মানুষ এক সঙ্গে বাঁচবে কী করে, কাজ করবে কী করে? কথাগুলো জীবনে অন্তত এক বার উচ্চারণ করেনি, আর্তস্বরে অথবা নীরব ক্ষোভে, এমন মানুষ হয়তো সংসারে নেই। বিশ্বাস করে কে না ঠকেছে? সেই আঘাতের প্রতিফলন ভাষাতেও— ‘বিশ্বাসঘাতক’। বিশ্বাসকে হত্যা করে যে। ‘হত্যাকারী’ বা ‘ঘাতক’ কথাটি প্রাণীহত্যার প্রসঙ্গেই প্রয়োগ হয়, মানবমনের কোনও একটি অনুভূতির প্রেক্ষিতে তার ব্যবহার কি আশ্চর্য নয়? প্রেম, অপত্যস্নেহ বা মাতৃভক্তিও অমূল্য। তাকে নস্যাৎ করে যারা, তারাও ধিক্কৃত হয়। কিন্তু বিশ্বাসভঙ্গকারীর অপরাধ যেন অন্য মাত্রার— মানুষে-মানুষে সম্পর্কের ভিত্তিকেই নস্যাৎ করে সে। সম্পর্কের বাইরে মানুষ কী, কতটুকু? শিশুদের মুখের ছড়াতেও ভরসা করার আকুতির আভাস মেলে। ‘এক শালিকে দুঃখ, দুই শালিকে খুশি’ এই ছড়ার শেষে বলা হচ্ছে, ছয় শালিক দেখলে সোনা, কিন্তু সাত শালিক? “সেভেন ফর আ সিক্রেট নেভার টু বি টোল্ড”— সাত শালিক দেখার বিরল সৌভাগ্য এমন গোপন কথার জন্য, যা কেউ ফাঁস করবে না। বিশ্বাসের দাম সোনার থেকেও বেশি। আর বিশ্বাসভঙ্গকারীর স্থান সবার নীচে। কবি দান্তে তাঁর কল্পিত নরকে সপ্তম স্তর, অর্থাৎ সর্বনিম্ন, বরফশীতল স্তরটি রেখেছেন বিশ্বাসঘাতকদের জন্য। তাদেরও তিনটি ভাগ করেছেন। যারা পরিবারকে প্রতারণা করে, যারা দেশকে প্রতারণা করে, আর যারা আশ্রিত বন্ধু বা অতিথিকে প্রতারণা করে। এই শেষ অপরাধীদের কাঁদারও উপায় নেই, তাদের চোখের উপর জমে রয়েছে বরফ।

কাকে বিশ্বাস করা চলে, কে ভরসার যোগ্য, এ প্রশ্নটা অতএব বার বার ফিরে এসেছে রাজনীতির নানা সন্দর্ভে। মহাভারতে শরশয্যায় শায়িত ভীষ্ম রাজা যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম সম্পর্কে যে উপদেশ দিয়েছেন, তার মধ্যে রেখেছেন রাজা ব্রহ্মদত্ত এবং পক্ষিমাতা পূজনীর কথা। পূজনী রাজার প্রিয় পাখি, একই দিনে জন্ম রাজার ছেলে এবং পাখির শাবকের। এক দিন নেহাত খেলার ছলে শিশু রাজপুত্র পক্ষিশাবককে হত্যা করে। পাপের শাস্তি না দেওয়া অধর্ম, মনে করে পূজনী পায়ের নখ দিয়ে রাজপুত্রের চোখ দু’টি নষ্ট করে দেয়। ব্রহ্মদত্ত তার পরেও তার প্রিয় পাখিকে রাজবাড়িতেই বাস করতে বলে— দু’তরফেই ক্ষতি হয়েছে, শোধবোধ হয়ে গিয়েছে, পূজনী কেন প্রাসাদ ছাড়বে? উত্তরে সেই প্রাজ্ঞ পাখি রাজাকে বলে, অপকারীর অপকার করে শোধ নেওয়া যায়, কিন্তু সখ্যভাব পুনরুদ্ধার হয় না। প্রবোধ বা সান্ত্বনাবাক্যে ক্ষত মুছে যায় না, তিক্ততা বাড়তে থাকে। পুত্র, ভ্রাতা, সব আত্মীয়-স্বজনই স্বার্থের কারণে সম্পর্কে যুক্ত হয়, স্বার্থ উপেক্ষিত হলে নিমেষে সম্পর্ক ভেঙে যায়। নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন না করাই শাসকের পক্ষে মঙ্গলজনক। এমন সাবধানবাণী কৌটিল্য থেকে ম্যাকিয়াভেলি, কে না শুনিয়েছেন? কী করে চিনে নিতে হবে বিশ্বস্ত লোক, কেমন করে বাজিয়ে নিতে হবে তাঁদের, এবং সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের উপরেও সম্পূর্ণ আস্থা রাখা চলবে না, বাতলে গিয়েছেন তাঁরা। সে সব কথার মূল্য আজকের শাসকের কাছেও কম নয়। যেমন, যে নিজেকে শাসকের চাইতে বড় ভাবে, সে ভাল মন্ত্রী হতে পারে না, বলেছেন ম্যাকিয়াভেলি। হক কথা।

স্বজন যদি দুর্বৃত্ত হয়ে ওঠে, তখন এক মস্ত নৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়— আপনজনের বিশ্বাস, আস্থার সুরক্ষা, নাকি ন্যায় রক্ষা, ধর্মের রক্ষা? বিভীষণ বার বার রাবণের কাছে আবেদন করেছিলেন অপহৃতা সীতাকে রামের হাতে ফিরিয়ে দিতে, রাজধর্ম পালন করতে। রাবণের কাছে প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত হয়ে তিনি যে রামের কাছে গিয়েছিলেন, এ নিঃসন্দেহে তাঁর ধর্মবোধ, ন্যায়বোধের পরিচয়। রামের শিবির-দুয়ারে সপার্ষদ বিভীষণ উপস্থিত হতে আলোড়ন পড়ে যায়। সুগ্রীব বলেন, যিনি বিপৎকালে ভ্রাতাকে ত্যাগ করে এসেছেন, তাঁকে পরিহার করাই উচিত। শুনে রাম ঈষৎ হেসে বলেছিলেন, শত্রু উপস্থিত হলে জ্ঞাতি বিরুদ্ধে যায়, রাজ্যলাভের আশাতেই বিভীষণ উপস্থিত হয়েছেন। “সকলেই ভরতের তুল্য ভ্রাতা বা আমার তুল্য পুত্র বা তোমার তুল্য সুহৃৎ হয় না।” তুলনার চয়নেই রয়েছে রামের ঈষৎ হাসির কারণ— ‘সুগ্রীবের তুল্য ভ্রাতা’ বলা যেত কি?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Trust Faith

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy