×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

ভরসা থাকুক

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০৫:০১

গত কয়েক সপ্তাহে কেন্দ্রীয় সরকার বারে বারেই স্মরণ করাইয়া দিয়াছে যে, হোটেল, বিমান সংস্থা, এমনকি লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পরিচালনা করাও সরকারের কাজ নহে। সেই দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থার হাতে ছাড়িয়া দেওয়াই ভাল। কথাটি আঠারো আনা সত্য। সরকারের কাজ পরিকাঠামো গড়িয়া দেওয়া; বাজার যাহাতে কাজ করিতে পারে, তাহা নিশ্চিত করা— বাজারের কুশীলব হইয়া উঠা নহে। এক্ষণে প্রশ্ন উঠিবে, সরকার যদি নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে সত্যই এতখানি সচেতন হয়, তবে কোভিড-১৯ প্রতিষেধকটিকে এমন যক্ষের ধনের ন্যায় আগলাইয়া আছে কেন? যথেষ্ট প্রতিষেধক উৎপাদন হইতেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাহা পৌঁছাইয়া দেওয়ার নেটওয়ার্কও সক্রিয়। এই অবস্থায় সরকারের কর্তব্য: প্রতিষেধক প্রদানের দায়িত্বটি বাজারের হাতে ছাড়িয়া দিয়া সম্মানজনক দূরত্বে সরিয়া দাঁড়ানো, সেখান হইতে ব্যবস্থাপনার উপর নজর রাখা। কে কবে কোন সংস্থার তৈরি করা টিকা লইতে চাহেন, সেই সিদ্ধান্তটি ব্যক্তির উপর ন্যস্ত হওয়াই বিধেয়।

সরকারের তরফ হইতে সম্ভবত আপত্তি উঠিবে যে, এত বড় একটি বিষয়ের দায়িত্ব কি কেবলমাত্র বাজারের হাতে ছাড়িয়া দেওয়া যায়? কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন বলিয়াছেন, গোটা দায়িত্বটি সরকারের হাতে থাকিলে লোকের কাছে ‘ভুল’ টিকা পৌঁছাইবে না। কথাটির কী অর্থ, তিনিই জানেন— তবে, অনুমান করা চলে যে, তিনি হয়তো ভাবিতেছেন, সরকারের হাতে থাকিলে টিকার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাইবে। এই কথাটি ভাবিবার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নাই। ক্যানসার হইতে জটিলতম স্নায়ুরোগ, সবেরই সর্বোচ্চ গুণমানের ঔষধ যখন বাজার-ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের হাতে পৌঁছাইতেছে; রোটা ভাইরাস হইতে নিউমোনিয়া, সব রোগের টিকাও যখন বাজারই বণ্টন করিতেছে, কোভিডের ক্ষেত্রেই বা তাহা না হইবার কারণ কী? এখনও অবধি বাজারের তুলনায় সরকার নিজের কুশলতা প্রমাণ করিতেও পারে নাই। টিকাকরণের তৃতীয় দফা, অর্থাৎ উচ্চ কোমর্বিডিটিসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর নিকট টিকা পৌঁছাইবার কাজটি এখনও বকেয়া। কুশলতার যুক্তির বিপরীত প্রান্তে থাকিতে পারে সামাজিক দায়িত্বের যুক্তি— বাজার-ব্যবস্থায় গরিব মানুষ যাহাতে বঞ্চিত না হন, তাহা নিশ্চিত করিতেই সরকার বণ্টনের দায়িত্বটি নিজের হাতে রাখিতে চাহে। সর্বজনীন গণবণ্টন ব্যবস্থার পক্ষেও এই একই যুক্তি ব্যবহৃত হইত, এবং তাহার অসারতাও বহু পূর্বেই প্রমাণিত। প্রয়োজনে সরকার নগদ হস্তান্তরের মাধ্যমে গরিবের হাতে টিকার টাকা পৌঁছাইয়া দিক, কিন্তু তাহার জন্য বাজারের পথ রুদ্ধ করা বুদ্ধিহীনতার পরিচায়ক।

টিকার ক্ষেত্রে সরকারের বাজার-বিরোধী অবস্থান একটি সত্য প্রকাশ করে, এবং একটি আশঙ্কার জন্ম দেয়। সত্যটি এই রূপ: সরকার মুখে যতই বাজারের গুণগান করুক, তাহার অন্তরে রাষ্ট্রবাদের আসনটি অক্ষয়। নচেৎ, কে কোন সংস্থার উৎপাদিত টিকা লইবেন, কোন সংস্থা কোথায় কত টিকা সরবরাহ করিবে, এই বিষয়গুলি লইয়া সরকার মাথা ঘামাইত না। পরিকাঠামো তৈরি করিয়া ব্যবস্থাপনা ও নজরদারিতে মনোনিবেশ করিত। বাজারের কুশলতায় বিশ্বাসী না হইয়াও বাজার-ব্যবস্থা ও বেসরকারি পুঁজির জয়গানে আশঙ্কা হয়, তাহা সম্ভবত সাঙাততন্ত্রের পরিসরটিকে আরও বর্ধিত, আরও সম্প্রসারিত করিবার অছিলামাত্র। বাজারের নিজস্ব শক্তিতে আস্থা নহে, সেই জয়গান সম্ভবত কতিপয় শিল্পগোষ্ঠীর আরও বেশি মুনাফার ব্যবস্থা করিয়া দেওয়ার নান্দীমুখ। এই আশঙ্কাটি সত্য হইলে তাহা ভয়ঙ্কর। এবং, আশঙ্কাটিকে মিথ্যা প্রমাণ করিবার দায়িত্ব সরকারের উপরই বর্তায়। বাজারের প্রতি আস্থা যে ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করিবার কৌশলমাত্র নহে, তাহা প্রমাণ করা জরুরি।

Advertisement
Advertisement