E-Paper

বিভাজনের বিষ

সমান্তরালে খিদিরপুর-মেটিয়াবুরুজ নিয়ে সমাজের অস্বস্তি, বা ঠাকুরনগর নিয়ে ঠাট্টা-ব্যঙ্গের দিকে আয়নাটা ঘোরালে সামাজিক বিভাজনের খর বাস্তবটা স্পষ্ট দেখা যাবে।

শেষ আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩৩

দেশের সংবিধানে জ্বলজ্বল করছে সাম্যের কথা, রাষ্ট্রের নীতিও আবর্তিত তা ঘিরে। অন্তত, আবর্তিত হওয়ার কথা। কিন্তু তত্ত্ব ও প্রয়োগ যে একেবারেই আলাদা, জাতপাত ও ধর্মের বৈষম্য যে আজকের ভারতে অতি প্রকট— তার একটি প্রমাণ যদি হয় চার পাশের সমাজবাস্তবতা, আর একটি তবে তথ্য-পরিসংখ্যান। ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকনমিক রিসার্চ-প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে ভারতের শহর ও গ্রামের ১৫ লক্ষ ‘পাড়া’র বিন্যাস বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, একুশ শতকের ভারতে রোজকার জীবন চলছে জাতি-বর্ণ ও ধর্মভিত্তিক বিভাজন সঙ্গী করে, এবং মুসলমান ও তফসিলি জাতির মানুষেরা তার শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। বাসস্থান ও সরকারি পরিষেবার সুবিধা, এই দুইয়ের বিচারেই এই দু’টি ‘সংখ্যালঘু সমাজগোষ্ঠী’র অবস্থা করুণ। আবার দেখা যাচ্ছে, তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষের তুলনায় মুসলমানদের বাসস্থানগত বিচ্ছিন্নতা বেশি, এবং সেই বিচ্ছিন্নতা গ্রামের তুলনায় শহরে আরও বেশি: নগরায়ণ, আধুনিক জীবনযাত্রাও তা পাল্টাতে পারেনি।

এই গবেষণা দেখায়, সময়টাই শুধু পাল্টেছে, সমাজ নয়। গ্রামের প্রান্তে তথাকথিত নিম্ন বর্ণ ও জাতিভুক্ত মানুষের বসবাস ভারতে চালু আজও, বড় শহরের ক্ষেত্রেও ‘মুসলমান পাড়া’ বললে কিছু নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত। দুই বাস্তবতাই প্রমাণ, একুশ শতকেও ভারতের গ্রাম ও শহরে সামাজিক ভাবে সংখ্যালঘু মানুষের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক গণ্ডিতে বেঁধে বেঁধে থাকা যত না স্বাজাত্যবোধ-আবেগে, তারও অনেক বেশি তাঁদের সংখ্যাগুরু ‘প্রতিবেশী’দের বিভাজনের মুখে পড়ে, বাধ্য হয়ে। বড় শহরে নিম্নবিত্তের কথা ছেড়েই দেওয়া যাক, আর্থিক সঙ্গতিপন্ন মুসলমান মানুষেরও ভাড়াবাড়ি পেতে বা রুচিশীল আবাসনে ফ্ল্যাট কিনতে গিয়ে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার নানা ঘটনা প্রচারমাধ্যম সূত্রে আজ চোখের সামনে। তার সমান্তরালে খিদিরপুর-মেটিয়াবুরুজ নিয়ে সমাজের অস্বস্তি, বা ঠাকুরনগর নিয়ে ঠাট্টা-ব্যঙ্গের দিকে আয়নাটা ঘোরালে সামাজিক বিভাজনের খর বাস্তবটা স্পষ্ট দেখা যাবে।

গবেষণার অন্য নির্ণয়টি আরও ভয়ঙ্কর, কারণ তা বলছে, জাতপাত-ধর্মের বিভাজনের কারণে এই মানুষেরা সরকারি পরিষেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। সামাজিক ভাবে প্রান্তিক এই মানুষেরা যে পাড়া বা অঞ্চলে থাকছেন, সেখানে বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা, নিকাশি ব্যবস্থা, জল ও বিদ্যুৎ পরিষেবার মতো সুযোগসুবিধাগুলিও কম কিংবা অব্যবস্থায় ভরা: সম্পূর্ণত মুসলমান মানুষের বাস, এমন পাড়ায় ১৩% কম প্রাথমিক স্কুল, ৪৬% কম মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ২০% কম স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে— যে পাড়ায় কোনও মুসলমান মানুষ নেই তার তুলনায়। অর্থাৎ সামাজিক বিভাজনের কারণে শুধু বাসস্থানই নয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকার এবং নাগরিক সুযোগসুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা। এ অত্যন্ত অন্যায়, অবৈধ ও অসাংবিধানিক— জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবশ্যকর্তব্য। বাস্তবে তা হচ্ছে কি না তা দেখা সরকারের কাজ: কেন্দ্রে বা রাজ্যে, যে কোনও দল পরিচালিত সরকারের শাসনামলেই সামাজিক বিভাজনের ফলে নাগরিক ও মানব-অধিকারের এ-হেন লঙ্ঘন জঘন্যতম অপরাধ। একটি সভ্য দেশে অন্তত এ জিনিস চলতে পারে না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Constitution of India

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy