নতুন বছরের তিনটি মাত্র দিন পেরিয়ে চার তারিখে পৌঁছেছে জানুয়ারি মাস। এর মধ্যেই কারও কারও নতুন বছরের শপথ ভেঙেছে, অনেকের ভাঙেনি— কিন্তু, আগের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা যদি মাপকাঠি হয়, তবে বহু মানুষই জানেন, সে সব শপথের আয়ু আর খুব বেশি দিন নয়। প্রশ্ন হল, নিজের অভ্যাস পাল্টানো অতি কঠিন জেনেও প্রতি বছর পয়লা জানুয়ারি মানুষ এমন ‘নিউ ইয়ার্স রেজ়লিউশন’ নেয় কেন? কারণটি সহজ: কিছু অভ্যাস যে পাল্টে ফেলা জরুরি, নিজের ভাল থাকার জন্যই জরুরি, এ কথাটা বেশির ভাগ মানুষই জানেন। আর, বছরের প্রথম দিন অথবা জন্মদিন এমনই এক-একটা দিন, যখন মনে হয় যে, নতুন কিছু শুরু হচ্ছে— এমন একটা দিন, যখন নতুন কিছু শুরু করা যায়। কিন্তু, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই পাল্টে ফেলার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পাল্টানো সম্ভব হয় না কেন? কারণ বহুবিধ, তার মধ্যে অন্যতম হল, মানুষ যে অভ্যাসটি পাল্টানোর কথা ভাবে, সেই অভ্যাসটি অকারণ নয়— সে কাজ করতে ভাল লাগে, তার থেকে চটজলদি পরিতৃপ্তি পাওয়া যায় বলেই অভ্যাসটি গড়ে উঠেছে। যেমন ধূমপান, যেমন অস্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া, যেমন অহেতুক খরচের অভ্যাস। প্রতিটিই ক্ষতিকর, কিন্তু প্রতিটিই অন্তত সাময়িক পরিতৃপ্তি দেয়। ফলে, এই অভ্যাসগুলি ছাড়ার অর্থ, সেই পরিতৃপ্তিকেও ত্যাগ করা। দু’এক দিনের জন্য যদি বা সেই ত্যাগ সহ্য করা যায়, দীর্ঘমেয়াদে অনেকেই তা পারেন না। তাঁরা ফিরে যান পুরনো অভ্যাসে, নববর্ষের প্রতিজ্ঞারও ইতি হয়।
কু-অভ্যাস থেকে পাওয়া চটজলদি তৃপ্তিকেও ত্যাগ করা কঠিন হয় কেন? কারণ, বেশির ভাগ মানুষই ইচ্ছাশক্তির জোরে এই পরীক্ষায় উতরোতে চান। কিন্তু, মনস্তত্ত্বের বিবিধ গবেষণা বলছে যে, মানুষের ইচ্ছাশক্তির পরিমাণ সীমিত, এবং তার অতিরিক্ত ব্যবহারে মগজ ক্লান্ত হয়। মস্তিষ্কের সিস্টেম টু, অর্থাৎ মানুষের ‘সচেতন মন’— যা যুক্তির বিন্যাস বোঝে, বিবিধ জটিল প্রশ্নের সমাধান করে, আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে— তার উপরে দৈনন্দিন বিবিধ চাপ থাকে, এবং পরিস্থিতি ভেদে সে চাপ বাড়ে। তখন ঘাটতি পড়ে ইচ্ছাশক্তিতে— স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণের শপথ ভেঙে মানুষ ‘জাঙ্ক ফুড’ খেয়ে ফেলেন, অথবা ‘কাল হাঁটতে যাব’ বলে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। চটজলদি তৃপ্তি অর্জন থেকে নিজেকে আটকানোর অর্থ, মগজের সিস্টেম টু-র উপরে সর্ব ক্ষণের বোঝা চাপিয়ে রাখা। বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই সেই বোঝা বহন করা অসম্ভব, বিশেষত যাঁদের জীবনে অন্য গোত্রের চাপ রয়েছে। যিনি নিরন্তর আর্থিক সঙ্কটে রয়েছেন, অথবা যাঁর সর্ব ক্ষণ সময়ের অভাব, তাঁদের পক্ষে নববর্ষের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা অন্যদের চেয়েও বেশি কঠিন। অথবা, যাঁরা ইতিমধ্যেই কোনও অসুস্থতার কারণে নিজেদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁদের পক্ষে বাজে খরচ বন্ধ করার শপথ রক্ষা করা সম্ভবত কঠিনতর, কারণ ‘ডায়েটিং’-জনিত আত্মনিয়ন্ত্রণ তাঁদের সিস্টেম টু-র উপরে এমনিতেই চাপ তৈরি করে।
তা হলে কি এমন প্রতিজ্ঞার আদৌ কোনও অর্থই হয় না? সে কথা বলার কারণ নেই। যাঁরা নিতান্ত ইচ্ছাশক্তির জোরেই অতিক্রম করতে পারেন নিজেদের বিবিধ দুর্বলতা, তাঁদের জন্য অন্য কোনও কৌশলের প্রয়োজন নেই। কিন্তু, যাঁরা তা পারেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে উপায় কী? প্রথমত, একই সঙ্গে অনেক কিছু পাল্টে ফেলার চেষ্টা না করাই বিধেয়। দ্বিতীয়ত, পুরনো কু-অভ্যাস ত্যাগ করার বদলে যদি নতুন সু-অভ্যাস গঠনের শপথ করা হয়, তবে তা রক্ষা করা সহজতর হয়। ‘জাঙ্ক ফুড’ ত্যাগ করার প্রতিজ্ঞার বদলে প্রতি দিন অন্তত এক বেলা স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণের প্রতিজ্ঞা করা বিধেয়; বাজে খরচ বন্ধ করার শপথের চেয়ে নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার কথা ভাবা ভাল। তৃতীয়ত, এক ধাক্কায় পাল্টে যাওয়ার চেষ্টা না করে ছোট ছোট লক্ষ্য স্থির করা জরুরি। সরাসরি কোটি টাকা জমিয়ে ফেলার শপথ রক্ষা করা মুশকিল— তার চেয়ে সহজ প্রতি দিন দশ টাকা জমানোর শপথ। তাতে এক দিকে যেমন সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে ওঠে, অন্য দিকে লক্ষ্য পূরণ হওয়ার তৃপ্তিও পাওয়া যায়। এই তৃপ্তিই মানুষকে শপথ রক্ষার কাজে ধারাবাহিক হতে সহায়তা করে। চতুর্থত, শপথ রক্ষার সাফল্য উদ্যাপন করতে পারাও দরকার। প্রতিটি লক্ষ্যে পৌঁছনোর পর নিজেকে ছোটখাটো পুরস্কার দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়। তাতে পরবর্তী ধাপে জয়লাভের কাজটি সহজতর হয়। নিজের বিরুদ্ধে জয় অর্জন করার চেয়ে নিজের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করা অনেক সহজ কাজ, এ কথা মনে রাখলেই যথেষ্ট।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)