বিছানায় শুয়ে এ পাশ-ও পাশ, মাঝরাতে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালানো, আর ভোরের অ্যালার্ম বাজার আগে কয়েক মুহূর্তের তন্দ্রা— প্রায় প্রতি ঘরেই ছবিটা খুব চেনা। ঘুম নেই চোখে। ঘুম আসতেও চায় না। অনেকেই বলবেন, শেষ কবে একটানা ঘুমিয়েছেন তা মনে পড়ে না। ঘরে ঘরে নিদ্রাহীনতার এই ছবিটা ভয় ধরানোই বটে। সাম্প্রতিক সমীক্ষাতেও তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। দেশ জুড়ে করা এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৪৬ শতাংশ ভারতীয়ের দু’চোখ থেকে ঘুমই উড়ে গিয়েছে। রাতে শুয়ে টানা ৬ ঘণ্টাও ঘুমোন না বেশির ভাগই। ‘স্লিপ ক্রাইসিস’ তাই এই সময়ের সবচেয়ে বড় শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি বলেই গণ্য করা হচ্ছে।
সমীক্ষায় যা দেখা গেল
৩৯৩ জেলায় সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে, ৮৯ হাজারের বেশি মানুষ কম ঘুম বা অনিদ্রার সমস্যায় ভুগছেন।
রাতে ৬ ঘণ্টারও কম ঘুম হয়, এমন মানুষজনের সংখ্যা ৪৬ শতাংশের বেশি।
দেশের বড় শহরগুলিতে ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন বেশির ভাগ মানুষজন। শ্রমজীবী মানুষের একটা বড় অংশ রাত ১টা বা ২টোর আগে শুতেই যান না।
মহিলাদের মধ্যে অনিদ্রার সমস্যা পুরুষদের তুলনায় কিছু বেশি।
আরও পড়ুন:
কেন ঘুম আসে না?
চিকিৎসকেরা বলেন, শরীরেরও একটা ঘড়ি আছে। সে-ও কাঁটায় কাঁটায় চলতে চায়। খিদে পাওয়ার যেমন সময় আছে, ঘুমেরও তেমন সময় আছে। আর সেই সময়ে যদি ঘুম না আসে, তা হলে সেটিও কিন্তু একটি রোগ। রোজের জীবনযাপন পদ্ধতির মধ্যে এমন অনেক ত্রুটি আছে, যা এই অনিদ্রার কারণ হতে পারে। ঘুমের সময়ে শরীর বিশ্রামে থাকলেও মস্তিষ্ক সজাগ থাকে। শরীরের বিভিন্ন কোষের পুনরুজ্জীবনের কাজ হয় সে সময়ে। তাই টানা ঘুমিয়ে জেগে ওঠার পরে শরীর সতেজ ও মন ফুরফুরে লাগে। এই প্রক্রিয়াটি বিগড়ে গেলে তখন সমস্যা শুরু হয়।
মেলাটোনিন হরমোন অন্ধকারে নিঃসৃত হয়। দিনের বেলায় উজ্জ্বল আলোয় মেলাটোনিন ক্ষরণ কমে যায়। সূর্যাস্তের পরে অন্ধকার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই হরমোনের ক্ষরণ বাড়তে থাকে। কিন্তু এখন রাতভর আলো জ্বালিয়ে টিভি দেখা, ল্যাপটপে কাজ বা অন্ধকার ঘরে মোবাইলের নীল আলো মেলাটোনিনের ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। সে কারণে ঘুম আসতে চায় না।
নাইট শিফ্টে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁদের ঘুমোনোর সমস্যা বেশি হয়। নাইট শিফ্ট যদি নিয়মিত হয়, সে ক্ষেত্রে দিনের কোনও একটা সময়ে ঘুমের অভ্যাস থাকলে ঘুমের অভাব হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কেউ যদি দু’দিন নাইট শিফ্ট করে আবার একদিন ডে শিফ্ট আবার দু’দিন নাইট শিফ্টে কাজ করেন, তখন কিন্তু তাঁর ঘুমে বিঘ্ন ঘটবে। এতে ‘স্লিপ সাইকেল’ নষ্ট হয়। এত বদল শরীর মানিয়ে নিতে পারে না।
কাজের ক্ষেত্র বাদ দিলেও এখন ডিজিটাল জীবন এতটাই সক্রিয় যে, ঘুমের সময় নষ্ট হচ্ছে বেশি। মোবাইল বা ল্যাপটপের এত বাড়বাড়ন্ত যখন ছিল না, তখন সারাদিন কাজের শেষে ক্লান্ত হয়ে ফিরে রাতে সঠিক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস ছিল। কিন্তু এখন তা বদলেছে। শরীর ও মন যতই ক্লান্ত থাকুক, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলে স্ক্রল না করলে ঘুম আসে না। এতে মস্তিষ্ক উত্তেজিত হয়ে যায়। একটা সময় পরে ফোন বন্ধ করে ঘুমোতে চাইলেও ঘুম আসতে চায় না। এর থেকেই দেখা দেয় অনিদ্রার সমস্যা, কমে যায় স্মৃতিশক্তি, স্নায়ুর রোগ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ভাল ঘুম না হলে অবসাদও গ্রাস করে। এর থেকে রেহাই পেতে হলে রোজ নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করা জরুরি। তা হলেই আর ঘুমের সমস্যা হবে না।