Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৫ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

আরও হামলার জন্য তৈরি

সার্জিকাল স্ট্রাইকে পাকিস্তানের সেনা আদৌ ভয় পায়নি

কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ১৪ ফেব্রুয়ারি সিআরপিএফ কনভয়ের ওপর সন্ত্রাসবাদী হানায় ৪৫ জন জওয়ানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর গোটা দেশই কেন্দ্রীয় সরকারের পাশ

ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০০:০২

কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ১৪ ফেব্রুয়ারি সিআরপিএফ কনভয়ের ওপর সন্ত্রাসবাদী হানায় ৪৫ জন জওয়ানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর গোটা দেশই কেন্দ্রীয় সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই হিংস্রতার নিন্দা করেছে। রাজনৈতিক নেতারা ও বুদ্ধিজীবীরা যেমন এই ঘটনায় পাকিস্তানের নিন্দা করেছেন, বৃহত্তর নাগরিক সমাজও করেছে। এই আক্রমণের পিছনে পাকিস্তানের হাত স্পষ্ট। যে মাসুদ আজহার ও তার সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী জইশ-ই-মহম্মদকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আশ্রয় দেয়, তারা এই আক্রমণের ‘কৃতিত্ব’ দাবি করেছে। এই প্রথম বার দেখছি, সন্ত্রাসবাদী হামলার প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন শহরে সাধারণ নাগরিকরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পথে নেমেছেন, নিহতদের সম্মানে মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন।

এই সময়টা কারও দিকে অভিযোগের আঙুল তোলার নয়, সত্যি। কিন্তু একটা প্রশ্ন বারে বারেই উঠছে— পাকিস্তানের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অনুশোচনাহীন আচরণ বন্ধ করার জন্য ভারত ঠিক কী করছে? এই প্রশ্নটার যথাযথ উত্তর কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে থাকতেই হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের তথাকথিত কঠোর নীতি, ২০১৬ সালের সার্জিকাল স্ট্রাইক যার অংশ ছিল— তার কী হল তবে? তা দিয়ে কেন সংযত করা যাচ্ছে না পাকিস্তানকে?

তাৎপর্যপূর্ণ হল, এই প্রশ্নটা যিনি উত্থাপন করেছেন, তিনি সাধারণ লোক নন— কিছু দিন আগে অবধি তিনি ভারতীয় আর্মির নর্দার্ন কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন। জম্মু ও কাশ্মীর তাঁর অধীনেই ছিল। লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডি এস হুডা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেছেন, সার্জিকাল স্ট্রাইক নিয়ে সরকার মিডিয়ায় বহু ঢাক পিটিয়েছে বটে, কিন্তু তাতে কাজের কাজ বিশেষ হয়নি। তিনি বলেছেন, ‘‘আমার মতে, ভারত এত দিন ধরে পাকিস্তানের ওপর যে চাপ তৈরি করেছে, সেটা ধারাবাহিক হয়নি।’’ ‘‘সীমান্তের ও পারে গিয়ে একটা অপারেশন সেরে আসাই যায়, কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু বদলায় না। বরং, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়ছে। অনুপ্রবেশ চলছে। (এবং) সাইবার আক্রমণও চলছে। আমার মনে হয় না, দু’বছরে এক বার একটা অপারেশন চালালে পাকিস্তানের ওপর তার বিশেষ প্রভাব পড়বে’’, ডি এস হুডার কথা দ্ব্যর্থহীন।

Advertisement

ভারতের অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে কতটা জানেন, পরখ করে নিন জ্ঞানভাণ্ডার

কোথায় ভুল হচ্ছে, সেই খোঁজ করার বদলে অনেকের প্রতিক্রিয়াই শুধুমাত্র পাকিস্তান-বিদ্বেষে আটকে রয়েছে। দেশের বহু প্রান্তেই যে উগ্র জাতীয়তাবাদের ঢেউ উঠেছে, তা দিয়ে বেশি দূর এগোনো যাবে না। অসহায় কাশ্মীরিদের ওপর আক্রমণ যে শুধু নিন্দনীয়, তা-ই নয়, বিপজ্জনকও বটে— এতে কাশ্মীরের মানুষ আরও বেশি বিচ্ছিন্ন বোধ করবেন।

তা ছাড়াও, কোনও বাছবিচার ছাড়াই যদি সব কাশ্মীরিকে শত্রু ঠাহরে নেওয়া হয়, তাঁদের আক্রমণ করা হয়, তাতে একটা মস্ত সত্য ঢাকা পড়ে যাবে— উপত্যকার বহু মানুষই মনেপ্রাণে ভারতের সঙ্গে আছেন। এবং, তাঁরা কাশ্মীরে প্রতি দিন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচছেন। অবশিষ্ট ভারতের রাস্তায় আর সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁরা উগ্র জাতীয়তাবাদী হুঙ্কার দিচ্ছেন, তাঁদের ক’জন বানিহাল পেরিয়ে উপত্যকার যুদ্ধক্ষেত্রে পা ফেলার সাহস করবেন?

পুলওয়ামার আক্রমণ যদি একটা কথাও প্রশ্নাতীত ভাবে প্রমাণ করে, তা হল এই: সার্জিকাল স্ট্রাইক সত্ত্বেও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নয়াদিল্লির নীতিতে ঘাবড়ায়নি। বরং, কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা ও আন্তর্জাতিক সীমান্তে ক্রমাগত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়িয়ে জবাব দিয়েছে। সংবাদে প্রকাশ, ২০১৮ সালে পাকিস্তান মোট ২৯৩৬টি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে। গত ১৫ বছরে সর্বোচ্চ। ৬১ জন ভারতীয় নিহত হয়েছেন, আহতের সংখ্যা ২৫০-র বেশি। ২০১৭ সালে এই রকম লঙ্ঘনের ঘটনা ছিল মাত্র ৯৭১টি। ৩১ জন নিহত হয়েছিলেন, আহত ১৫১। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছেন, ২০১৮ সালে সীমান্ত সংঘর্ষে যত বিএসফ জওয়ান মারা গিয়েছেন, তা আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি। ২০১৮ সালে বিএসএফ-এ প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ১৪, তার আগের বছর ছিল মাত্র চার। কাশ্মীর উপত্যকায় সন্ত্রাসবাদও বেড়েছে। হিসেব পাওয়া যাচ্ছে, ২০১৮ সালে আনুমানিক ১৮১ জন স্থানীয় যুবক জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়েছেন। সংখ্যাটি ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৫ সালে ছিল ৬৬, ২০১৬-তে ৮৮ আর ২০১৭ সালে ১২৬।

স্পষ্ট ভাষায় বললে, পাকিস্তান সার্জিকাল স্ট্রাইকে মোটেই ঘাবড়ায়নি, বরং আরও তেড়েফুঁড়ে উঠেছে। জইশ-ই-মহম্মদ ও তার খুনে প্রধান মৌলানা মাসুদ আজহারের পুনরুত্থান সাক্ষ্য দেবে। পুলওয়ামা কাণ্ডে মিলিটারি গ্রেড আরডিএক্স ব্যবহৃত হয়েছে। অনুমান করা সম্ভব, সন্ত্রাসবাদীদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভরসা বাড়ছে।

জেনারেল পরভেজ় মুশারফ এক বার বলেছিলেন, পাকিস্তানি সেনার স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্যই হল কাশ্মীর উপত্যকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দাবিয়ে রাখা। সমস্যা হল, ভারতীয় নেতৃত্ব বুঝেই উঠতে পারলেন না যে পাকিস্তানকে সেই লক্ষ্যে সফল হওয়া থেকে ঠেকাতে গেলে ‘ট্যাকটিকাল রেসপন্স’-এ কাজ হবে না, ‘স্ট্র্যাটেজিক রেসপন্স’ চাই। একটা দুটো সার্জিকাল স্ট্রাইক দিয়ে এই ‘স্ট্র্যাটেজিক রেসপন্স’ হয় না। পাকিস্তানের থেকে ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’-এর সুবিধা কেড়ে নিয়েও নয়। এগুলো বড় জোর প্রতীকী অবস্থান। দেখাই যাচ্ছে, ইসলামাবাদ তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

আর একটা পথ হল কাশ্মীর উপত্যকায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাড়ানো। কিন্তু, এটা মূলত রক্ষণাত্মক পদক্ষেপ। এতে সমস্যার মূলে পৌঁছনো যাবে না। ১৭ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ন্যাটো তালিবান সন্ত্রাসাবাদের বিরুদ্ধে লড়েও যে শেষ অবধি সফল হল না, সেটা এই কারণেই।

মুশকিল হল, এই সমস্যার সহজ সমাধান নেই। ভারতের সামনে দুটো পথ, যে কোনও একটাকে বেছে নিতে হবে— হয় মানতে হবে যে উপত্যকায় এই হিংস্রতা আর আক্রমণ চলবেই; নয়তো স্বীকার করতে হবে যে নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে জঙ্গিদের ঘাঁটিতে পুরোদস্তুর সামরিক আক্রমণ না করলে এই অবস্থায় কিছুতেই এই হামলা ঠেকানো যাবে না।

কিন্তু, পুরোদস্তুর আক্রমণ করতে হলে তো আমাদের সেনাবাহিনীকেও প্রস্তুত করতে হবে। গত দু’দশক ধরে একের পর এক কেন্দ্রীয় সরকার সেনাবাহিনীকে নিতান্ত অভাবে রেখেছে। নরেন্দ্র মোদীর সরকারও ব্যতিক্রম নয়।

মনমোহন সিংহের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার কোনও গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থাপনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। ভারতীয় বিমানবাহিনীর এক কালে ৪২-স্কোয়াড্রন ফোর্স ছিল। এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে ৩২টি স্কোয়াড্রনে। নরেন্দ্র মোদী ৩৬টি রাফাল বিমান কিনেছেন। তাতে মোটে বাড়তি দুটো স্কোয়াড্রন হবে। ভারতীয় সেনার কাছে দীর্ঘ দিন ধরেই ভাল রাইফেলের মতো নিতান্ত প্রাথমিক অস্ত্রশস্ত্রেরও ঘোর অভাব। অতি সম্প্রতি সরকার ৭৩,০০০ রাইফেল কেনার সিদ্ধান্ত করল। সাঁজোয়া গাড়ির অভাব, আগ্নেয়াস্ত্রের অভাব, হরেক যন্ত্রপাতির অভাব— ভারতীয় সেনার হাত পা বাঁধা।

এই অবস্থায় কোনও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন সরকারই সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের দিকে ঠেলতে পারে না। যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল বাহিনী প্রয়োজন, আকাশের দখল রাখার মতো বায়ুসেনার শক্তি প্রয়োজন। এখন বড় জোর পাকিস্তানের উপর একটা প্রতীকী আক্রমণই করতে পারে ভারত— সেটা সার্জিকাল হবে কি না, তা দেখার।

আর, দেশবাসী কাশ্মীরে আরও অনেক আত্মঘাতী হামলা, আরও অনেক রক্তপাত দেখার জন্য তৈরি থাকতে পারেন। এবং, সব দলের নেতারাই সেই রক্তপাতকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

আরও পড়ুন

Advertisement