সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

কী বা আসে যায়

protest
ফাইল চিত্র।

মুখোশ খুলিয়া ফেলো।— লন্ডনের রাস্তার পাশে এই দেওয়াল লিখন অনেকেরই নজর কাড়িয়াছে। শুধু লন্ডন নহে, দুনিয়া জুড়িয়া বহু মানুষ উচ্চকণ্ঠে এই কথাই বলিতেছেন। মুখোশ কেবল মুখোশ নহে, তাহা নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। কোভিড সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদে দেশে দেশে মিছিল সমাবেশ বিক্ষোভ চলিতেছে। সকলেরই দাবি: কোভিডের ভয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্তব্ধ করিয়া রাখা আর চলিবে না। দূরের কথা দূরস্থান, এই পশ্চিমবঙ্গেও মুখোশ খুলিবার পক্ষে জনমত উত্তরোত্তর প্রবল। দেওয়াল লিখন দেখা যায় নাই, স্লোগানও শোনা যায় নাই, তাহার কোনও প্রয়োজনও হয় নাই, পথেঘাটে দোকানপাটে সর্বত্র অগণিত নাগরিক মুখোশ খুলিয়া ফেলিয়াছেন, অথবা কণ্ঠহার করিয়া ঝুলাইয়া বুক ফুলাইয়া গলি হইতে রাজপথে যথেচ্ছ ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন, যথেচ্ছ মেলামেশা করিতেছেন, যথেচ্ছ ভিড় বাড়াইতেছেন। অর্থাৎ, অগণিত মানুষ সজ্ঞানে বেপরোয়া।

কোথা হইতে আসে এই বেপরোয়া আচরণ? কোন শক্তিতে তাহা লালিত হয়? অন্তর্লীন নিয়তিবাদ? ‘যাহা হইবার তাহা হইবে’ মনে করিয়া জীবন যাপনের অভ্যাস? হেলমেট না পরিয়া, এমনকি সহযাত্রী সন্তানের মাথাটিও অরক্ষিত করিয়া দুরন্ত গতিতে মোটর সাইকেল চালাইবার দৈনন্দিন দৃশ্যাবলিও নিয়তিবাদী মানসিকতা ছাড়া ব্যাখ্যা করা কঠিন বইকি। কিন্তু এমন মানসিকতা আকাশ হইতে পড়ে না। তাহার পিছনে থাকে অবশ্যই, রুজি রোজগারের তাগিদ। জনজীবনে ঝাঁপ ফেলিয়া দিলে অর্থনীতিও স্তব্ধ হয়। সুতরাং, স্বাভাবিকতায় ফিরিবার তাগিদ স্বাভাবিক। কিন্তু তাহার জন্য বেপরোয়া হইবার প্রয়োজন হয় না, বরং সকলে সংযত থাকিলে এবং প্রয়োজনের বেশি মেলামেশা না করিলে অর্থনীতি সচল রাখিবার কাজটি তুলনায় সহজ হয়। সুতরাং অর্থনীতি বা জীবনধারণের তাগিদ যথেচ্ছাচারের একমাত্র কারণ হইতে পারে না। সম্ভবত তাহার পিছনে আছে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ, যাহা ভাইরাসের মতোই সংক্রামক। অধিকাংশ কোভিড-আক্রান্ত মানুষ যে সুস্থ হইয়া উঠিতেছেন তাহা অবশ্যই স্বস্তিদায়ক, কিন্তু সেই স্বস্তির প্রেরণাতেই ব্যক্তি-মন ক্রমশ ধরিয়া লইতে থাকে যে, এই ব্যাধি লইয়া এত চিন্তার কিছু নাই। আশঙ্কা হয়, ব্যক্তি-নাগরিকের আত্মসর্বস্বতা এই প্রতিক্রিয়ায় প্রবল ইন্ধন জোগায়। নাগরিকরা জানেন, সংক্রমণ বাড়িলে বয়স্ক এবং অসুস্থ সহনাগরিকদের বিপদ বাড়িবে, বিপদ বাড়িবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। অল্পবয়সিরা জানেন, তাঁহাদের বেপরোয়া আচরণ আপন পরিবারেও প্রবীণ মানুষটির প্রাণসংশয় ঘটাইতে পারে, কিন্তু ‘তাহাতে আমার কী যায় আসে?’ ভাইরাস কেবল মানুষের দেহে বংশবৃদ্ধি করে না।

দ্বিতীয়ত, নাগরিককে সতর্ক এবং সচেতন করা যাঁহাদের দায়িত্ব, সেই রাষ্ট্র তথা রাজনীতির নায়কনায়িকারাও প্রায়শই তাহার বিপরীত কাজ করিতেছেন। আমেরিকার ট্রাম্প বা ব্রাজিলের বোলসোনারো তো সরাসরি গণ-ঘাতক দায়িত্বজ্ঞানহীনতার নিরলস কারবার চালাইয়া আসিতেছেন, কিন্তু ক্ষতি করিতে না চাহিয়াও ক্ষতি করিবার দৃষ্টান্ত কম নহে। দুর্ভাগ্যের কথা, পশ্চিমবঙ্গ কিছু কিছু ক্ষেত্রে তেমন ‘ভ্রান্তি’র মাশুল গনিতেছে। কোভিডের মোকাবিলায় যে স্থিতধী ও সুপরিকল্পিত নেতৃত্ব আবশ্যক ছিল, এই রাজ্যে তাহা সর্বদা মিলে নাই, রাজ্যের প্রশাসকরা আপন আতঙ্ক এবং সেই আতঙ্কজনিত অস্থিরচিত্ততার পরিচয় দিয়াছেন। ‘জনতোষণ’-এর তাগিদে সর্বজনীন শারদোৎসবের অনুমতি দিয়া তাঁহারা যে বিপদের সম্ভাবনা সৃষ্টি করিয়াছেন, সে বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁহার সহযোগীরা স্পষ্টতই ওয়াকিবহাল, সেই বোধের তাড়নাতেই তাঁহারা পূজার উদ্যোক্তা ও জনতাকে ক্রমাগত সংযমের বার্তা দিতেছেন। কিন্তু বিপদ তাহাতে কতটা সামাল দেওয়া যাইবে, মুখ্যমন্ত্রী নিজেও জানেন কি?

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন