সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সম্পাদকীয় ১

রাজনীতির পাঠ

Manohar Parrikar

ইট’স দি ইকনমি, স্টুপিড! ১৯৯২ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের বিরুদ্ধে প্রার্থী বিল ক্লিন্টনের যুগজয়ী প্রচারবাক্য। ভারতের বর্তমান অবস্থা দেখিয়া মনে হয়, বাক্যটিকে একটু ঘুরাইয়া বলিলেই হয়, ইট’স দ্য পলিটিকস, স্টুপিড! সকল পদক্ষেপ, সকল প্রচার, সবই এক ও অদ্বিতীয় রাজনীতির আবর্তে ঘুরিতেছে, সব কিছুর পিছনেই রাজনীতির মাটি-মানুষে মাখামাখি হিসাব। নূতন কিছু নহে, স্বাধীন দেশের জন্ম হইতে এমনই দস্তুর। তবু সম্প্রতি কথাটি বিশেষ ভাবে মনে পড়িতেছে। বহু নূতন সংস্কার ও নীতি তৈরি হইতেছে, যাহার জন্য মনোযোগ সমগ্রত নিবদ্ধ রাখা হইয়াছে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজের দিকে। তাহাদের প্রীতিই রাজনীতির চালিকা, কেননা সংখ্যায় যাহারা গুরু, ভোটেও তাহারা অধিক। মজা হইল, ভারতে যেহেতু সামাজিক বিভিন্নতা ও বিভাজন সত্যই অনন্ত, ক্রমে ইহাও স্পষ্ট হইতেছে যে এই আপাত-সংখ্যাগুরু সমাজও প্রকৃত অর্থে কোনও একক ও অভিন্ন সমাজ নহে, তাহার মধ্যেও প্রকাশ্যে এবং প্রচ্ছন্নে অনেক পার্থক্য ও বৈচিত্র বর্তমান। সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হইতেছে বিভ্রম: তবে কাহাকে তুষ্ট করার চেষ্টা করা উচিত, প্রকৃত জনগণেশ তবে কে? শাসকপক্ষ বিজেপির মধ্যে ক্রমেই এমন এক বিভ্রম বাহির হইয়া আসিতেছে, বোঝা যাইতেছে তাঁহারা আস্তে আস্তে সচেতন হইতেছেন যে, ‘সংখ্যাগুরু’ সমাজ বলিতে তাঁহারা একটি সরলীকৃত ধারণা ভাবিয়াছিলেন, বাস্তব ততখানি সরল নহে। গত সপ্তাহে গোয়ার বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী পর্রীকরের মুখে যখন গো-রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধেই সাবধানবাণী শোনা গেল, তাহার মধ্যে বিজেপি রাজনীতির এই বিভ্রম ও তজ্জনিত আত্মসংশোধনের চেষ্টা স্পষ্ট হইয়া ওঠে।

শেষ অবধি রাজনীতিই সত্য। সুতরাং গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী বুঝিতে পারিতেছেন, যে রাজ্যে পঞ্চাশ শতাংশের বেশি মানুষ গোমাংস-প্রেমী, যেখানে পর্যটন অর্থনীতির মৌলিক উপাদান গোমাংস, সে রাজ্য বিজেপি-শাসিত হইলেও সেখানে গোমাংস নিষিদ্ধের ঢালাও নির্দেশ এবং গোরক্ষক বাহিনীর অমিত অত্যাচার শেষ অবধি দল ও সরকারের মঙ্গল ঘটাইবে না। কর্নাটক হইতে গোয়ায় গোমাংস সরবরাহের ট্রাক ঢুকিবামাত্র গোরক্ষা বাহিনী আক্রমণে ঝাঁপাইয়া পড়িতেছে। মাংসবিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা কয়েক দিনব্যাপী লাগাতার ধর্মঘটে ব্যবসায়িক সুরক্ষার দাবি তুলিয়াছেন। বিরোধী দল কংগ্রেস সরব হইয়াছে যে, মুখ্যমন্ত্রী নাগপুরের দিকে না তাকাইয়া নিজের রাজ্যের দিকে তাকান। বিপাকে পড়িয়া পর্রীকর গোরক্ষকদের ভর্ৎসনা করিতে বাধ্য হইয়াছেন। নিয়ম মানিয়া গোমাংস ব্যবসায় কেহ বাধা দিতে পারিবে না, অন্যথা প্রশাসন কড়া ব্যবস্থা লইবে: তাঁহার ঘোষণা।

গোয়া এ দেশের একটি ছোট রাজ্য। দেশের আরও অনেক রাজ্যের অধিবাসীদের নিয়মিত খাদ্য গোমাংস। উত্তর-পূর্ব ভারতের জনজাতি-অধ্যুষিত ও মুসলিম অধিবাসী-সংবলিত রাজ্যসমূহে, দেশে বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়ানো দলিত সমাজের মধ্যে গোমাংস ভক্ষণ চালু। সমাজগত অভ্যাস ও ঐতিহ্যগত অনুশাসন, কোথাও এই প্রথার বিরোধিতা খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। হিন্দু সমাজ বলিতে আরএসএস এবং বিজেপি যে সংকীর্ণ আক্রমণাত্মক অসহিষ্ণু একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা বুঝিতেছে, হিন্দু সমাজেরই এক বিরাট অংশ ও অপরাপর ধর্মসমাজ তাহার বিরুদ্ধ। ফলত, সংখ্যায় কে ‘গুরু’, কে তত ‘গুরু’ নহে, ইহা বিষম জটিল অঙ্ক। অঙ্কের ঘায়ে সকল রাজনীতিকেই কালে দিনে বাড়াবাড়িগুলি ছাঁটিতে হয়। গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রথম কথা, অর্থাৎ মানুষের খাদ্যাভ্যাস-সংস্কৃতিতে নিয়ন্ত্রণ নয়— বিজেপি যদি-বা ইহা মানিতে নারাজ হয়, গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রথম কথা অর্থাৎ, বিচিত্র বিবিধের মধ্যে ঢালাও বিধিনিষেধ চালাইলে তাহা ব্যুমেরাং হইতে পারে, এইটুকু কি তাহারা ক্রমে বুঝিতেছে?  

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন