Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৮ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

বঙ্গাব্দের কত সাল আসছে, ক’জন হিসেব রাখেন তার?

১২ এপ্রিল ২০১৯ ০৫:১১

বাঙালি তখন তেমন দুধেভাতে না থাকলেও তার রীতিমতো বাঙালিয়ানা ছিল! তার বারো মাসের তেরো পার্বণের মধ্যে বাংলা নববর্ষ, মানে, ‘পহেলা বৈশাখ’ও ছিল।

তখন বাঙালির হালচাল ছিল নেহাতই বাঙালির মতো। পরিবার বলতে বেশির ভাগ যৌথ পরিবার। সেই পরিবারে ‘কর্তা’ নামক একজন থাকতেন। বাড়ির সবচেয়ে প্রবীণ পুরুষটিকেই সাধারণত সেই সম্বোধন করা হত। সংসারে তাঁর পরামর্শ নিতেন কনিষ্ঠেরা। মহিলাদের অবস্থান ছিল অন্দরমহলে। বাড়ি ছেড়ে তখনও জীবিকামুখো হননি তাঁরা।

হেঁশেল, অর্থাৎ, রান্নাঘরে তখন যাঁরা ভিড় করতেন, সেইসব সম্পর্কগুলো এখন প্রায় হারিয়ে গিয়েছে। ‘ফুল’, ‘ন’, ‘রাঙা’— এমন কত সম্পর্ক তখন একই পরিবারের মহিলাদের মধ্যে লতায়-পাতায় জড়িয়ে থাকত।

Advertisement

পুজোয় বা পয়লা বৈশাখে বাড়িতে ফিরতেন প্রবাসে চাকরি করা ছেলে। বাঙালির জীবনে তখন পয়লা বৈশাখ বিশেষ দিনই ছিল।

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের তখন জন্মই হয়নি। বেশির ভাগ স্কুল তখন নেহাতই সাদামাঠা। সেই সাধারণ স্কুলের ছেলেমেয়েরা তখন বাংলা বছরের প্রথম দিনটিকে পালন করত। কী ভাবে হত সেই দিনপালন?

নববর্ষ উপলক্ষে তখন স্টেশনারি দোকানে নানা রকমের কার্ড বিক্রি হত। তার উপর লেখা থাকত— ‘শুভ নববর্ষ’। কার্ড এক পাতার হত, কখনও আবার চার পৃষ্ঠারও। স্কুলপড়ুয়াদের কেউ কেউ তখন ড্রয়িং শিট কেটে কেটে নিজের হাতে কার্ড তৈরি করত। নানা রকম ছড়াও লিখত তারা সেই কার্ডে।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

সেই ছড়াগুলোর দু’একটা এই রকম— ‘তুমি আমার বন্ধু হও / নববর্ষের কার্ড লও’, ‘কলমে নেই কালি / মনেতে নেই জোর / নববর্ষের কার্ড লিখতে / রাত্রি হল ভোর’।

নববর্ষের দু’একদিনও পরেও চলত কার্ড দেওয়া-নেওয়ার পালা। তারপর গুনে দেখা হত, কার প্রাপ্তি ক’টা কার্ড।

জমজমাট খাওয়া সেদিন বাড়িতেই হত। রান্না করতেন বাড়ির মহিলারাই। মাছের মুড়ো অলিখিত ভাবে বরাদ্দ থাকত পরিবারের পুরুষদের জন্য। পাত পেড়ে খেতে বসেছেন বাড়ির পুরুষেরা। কাঁসার থালা আর বাটিতে তাঁদের সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে বিশেষ পদ। মাথায় ঘোমটা, হাতপাখা নেড়ে তাঁদের হাওয়া করছেন পরিবারের কোনও মহিলা— বেশির ভাগ বাঙালি পরিবারে নববর্ষের দিনে এমন দৃশ্যই তখন অতি-পরিচিত ছিল।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে আছে হালখাতা। বহু দোকানে গণেশপুজো করা হয় এ দিন। বিকেলে বা সন্ধ্যায় ক্রেতাদের হাতে মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে আদর-আপ্যায়ন করেন ব্যবসায়ীরা। একটা সময় পর্যন্ত এর সঙ্গে নিয়ম করে মিলত বাংলা বছরের নতুন ক্যালেন্ডারও। এখন সেই ক্যালেন্ডারও প্রায় হারিয়ে যাওয়ার মুখে।

বাংলা নববর্ষ থেকে এখন হারিয়ে গিয়েছে অনেকটা বাঙালিয়ানাও। পয়লা বৈশাখের আগে চৈত্র সেলে উপচে পড়া ভিড় এখনও আছে। নববর্ষের দিনে রাস্তাঘাট এখনও থাকে জমজমাট। জৌলুশ বেড়েছে অবশ্যই, কিন্তু কোথায় যেন আবছা হয়ে গিয়েছে উৎসবের সেই টান। তবে, সামাজিক মাধ্যমে নববর্ষে উৎসব পালনের কোনও খামতি নেই।

বৈশাখের প্রথম সকাল থেকেই ফেসবুক, হোয়াটস্‌অ্যাপে শুভেচ্ছার ঢল নামে। সঙ্গে ই-কার্ড বা ই-গ্রিটিংসের ছড়াছড়ি। প্রযুক্তির দাপটে মুছে গিয়েছে কাগজের সেই নববর্ষের কার্ড। হারিয়ে গিয়েছে সেই কার্ডে হাতে লেখা নববর্ষের শুভেচ্ছাবার্তাও। নববর্ষ উপলক্ষে কেনাকাটার জন্য ছোট দোকানের চেয়ে এখন ঝাঁ-চকচকে শপিং মলই পছন্দ অনেক বাঙালির। কেউ চান না এবং কারও কাজে লাগে না বলে বাংলা ক্যালেন্ডারের পাট চুকিয়ে দিলেও বহু ছোট দোকান এখনও ক্রেতার হাতে মিষ্টির প্যাকেট ধরায়। কিন্তু ছোট দোকানের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে শপিং মল।

অনেকটাই বদলে গিয়েছে বাংলা নববর্ষ নিয়ে বাঙালির ভাবনা। নবীন প্রজন্মের এক স্কুলপড়ুয়ার প্রশ্ন— ১লা বৈশাখ মানে কি একলা বৈশাখ? নববর্ষ উপলক্ষে মহা খুশি টোটোচালক। সে দিন ভিড় উপচে পড়ে। যত বেশি সময় পারবেন, টোটো চালাবেন বাড়তি রোজগারের আশায়। এখন নববর্ষ এমনটাই।

তবে, এখনও বহাল আছে নববর্ষ উপলক্ষে ভালমন্দ খাওয়াদাওয়া। পাত পেড়ে বাড়িতে এক সঙ্গে বসে খাওয়ার দিন তো কবেই চলে গিয়েছে! এখন অন্য ব্যবস্থা। স্পেশাল মেনু, শুক্তো, মোচার ঘন্ট, ভাপা ইলিশ বা চিংড়ির মালাইকারি কিংবা মুড়িঘন্ট— সবই মিলবে মাল্টিকুইজ়িন রেঁস্তরায়। কাঁসা বা পিতলের থালাবাটির দেখাও মিললে মিলতে পারে সেখানে। মিলতে পারে কলাপাতার উপর গরম গরম ঘি-ভাতও। আর চাইলে বাড়িতে বসে অনলাইন বরাত দিয়ে দেওয়া যায়।

সব মিলিয়ে পয়লা বৈশাখ জমজমাট তো বটেই। এখন ভোটের মরসুম। তবু মিটিং-মিছিল ছেড়ে কেউ কেউ হয়তো সেদিন একটু সময় বার করে নেবেন ‘হালখাতা করা’র জন্য।

কিন্তু প্রশ্ন হল, বঙ্গাব্দের কত সাল আসছে? ক’জনই-বা সে হিসেব রাখেন?

(লেখক জলপাইগুড়ির ফুলবাড়ি হাইস্কুলের বাংলার শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত)

আরও পড়ুন

Advertisement