নেতাদের কাছে বক্তব্য জানাইতে কোন নম্বরে ফোন করিতে হইবে, তাহার বিজ্ঞাপনে শহর ছাইয়া গিয়াছে। অথচ গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের মত জানাইবার একটি সুপরিচিত উপায় বরাবর আছে। তাহার নাম, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। মিছিল, ধর্মঘট, অবস্থান, অনশন— সমবেত দাবি জানাইবার বিবিধ পদ্ধতির দীর্ঘ এবং গৌরবপূর্ণ ইতিহাস রহিয়াছে। আজ যাঁহারা দেশের প্রণম্য নেতা, তাঁহারা এই সকল উপায়েই আন্দোলন করিয়া বঞ্চনা ও অন্যায়কে প্রতিহত করিয়াছেন। অতএব প্রশ্ন, এ রাজ্যের পার্শ্বশিক্ষকরা কী অপরাধ করিলেন? তাঁহারা অবস্থান আন্দোলন করিয়া তাঁহাদের দাবিগুলি রাজ্য সরকারকে জানাইতে চাহিয়াছিলেন। তাঁহারা রেল কিংবা রাস্তা অবরোধ করেন নাই। প্রথমে শিক্ষা দফতরের সম্মুখে, অতঃপর একটি বাস টার্মিনাসে অবস্থান করিয়াছেন। পুলিশ তাঁহাদের উপর এমন নির্মম ভাবে লাঠি চালাইল কোন যুক্তিতে? আইন যখন অপরাধীর মানবাধিকারকেও মর্যাদা দিবার নির্দেশ দেয়, তখন নিরপরাধ নাগরিকের সহিত এই অমানবিক আচরণের কারণ কী? কেহ হয়তো বলিবেন, পুলিশের দোষ নাই, তাহারা উপরতলার নির্দেশে চলিতে বাধ্য। ইহা অজুহাত মাত্র। জনসেবা, জনস্বার্থের সুরক্ষাই পুলিশের কাজ। নেতাদের অঙ্গুলিহেলনে কেন চলিবে পুলিশ, কেন নাগরিককে সুরক্ষিত রাখিতে কাজ করিবে না, সে প্রশ্নটি বারবার করা প্রয়োজন। কিছু দিন পূর্বে মাদ্রাসার শিক্ষকদের অবস্থানের উপরেও এমনই ভয়ানক নির্যাতন চালাইয়াছিল পুলিশ। তাহার তদন্ত কী হইল, কে দোষী, আজ অবধি রাজ্যবাসী জানিল না। অপরাধের উপর অপরাধ ঘটিতেছে। 

রাজ্য সরকারের হয়তো আশা, নূতন আঘাতের বেদনায় পুরাতন ব্যথা ভুলিবে রাজ্যবাসী। সরকার ভুলিয়াছে, অত্যাচারের স্মৃতি মুছিয়া যায় না। তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতি মলিন হয় নাই, খাদ্য আন্দোলনে গুলিচালনা বাঙালি ভোলে নাই, নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরের প্রতিবাদ মানসপটে চিরজাগ্রত। প্রতিটি বুলেট, প্রতিটি প্রহারচিহ্নের হিসাব বুঝাইতে হইয়াছিল ক্ষমতাসীন নেতাদের। তৃণমূল জমানাতেও শিক্ষক ও চিকিৎসকদের অমর্যাদার দৃষ্টান্তগুলি নিত্য-আলোচিত। সকল নাগরিকের সকল দাবি সরকারকে মানিতে হইবে, এমন অন্যায় প্রত্যাশা কাহারও নাই। মুখ্যমন্ত্রী বা শিক্ষামন্ত্রী মনে করিতেই পারেন, পার্শ্বশিক্ষকরা যে শর্তে কাজ করিতেছেন, সেগুলিই ন্যায্য, তাঁহাদের বেতনের অঙ্কও যথাযথ। কিন্তু সেই কথাগুলি তাঁহারা বুঝাইতে ব্যর্থ কেন? আলোচনার মাধ্যমে উপায় সন্ধান, দুই বিরুদ্ধ পক্ষের মধ্যে সহমত নির্মাণ, ইহাও কি নেতার কাজ নহে? বিরোধিতার পরিণামে সংঘর্ষ ভারতে নূতন কিছু নহে। কিন্তু ইতিপূর্বে সরকারের সহিত আলোচনায় বসিয়াও পথ বাহির না হইলে বিক্ষুব্ধরা আন্দোলনের পথে যাইত। তৃণমূল আমলে তাহার বিপরীতই যেন নিয়ম হইয়াছে। যে কোনও দাবি লইয়া পাঁচ জন একত্র হইলে সরকার প্রথমেই পুলিশ পাঠাইয়া তাঁহাদের বেশ করিয়া পিটাইয়া দেয়। তাহার পরেও পিছু না হটিলে সরকার আলোচনায় আহ্বান করে। সরকারি হাসপাতালে সুরক্ষা দাবি করিয়া চিকিৎসকদের ধর্মঘট, সরকারি স্কুলে নিয়োগ প্রার্থনা করিয়া অনশন, এবং সম্প্রতি পার্শ্বশিক্ষকদের বেতনবৃদ্ধির দাবিতে অবস্থান, সর্বত্রই দেখা গিয়াছে যে, ভীতিপ্রদর্শনে কাজ না হইলে সরকার আলোচনায় আহ্বান করিয়াছে। নাগরিকের কথা শুনিবার এমনই আগ্রহ দেখাইয়াছেন মুখ্যমন্ত্রী। 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন করিয়াছেন, শিক্ষকদের কালো ব্যাজ পরিয়া আন্দোলন করিতে দেখিলে কী শিখিবে শিশুরা? একই ধরনের প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রীকেও করিবার থাকে— শিক্ষকদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে পুলিশের লাঠিচালনার দৃশ্য হইতে কী শিক্ষা পাইল শিশুরা? ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করিবার মধ্যে কোনও লজ্জা নাই। অন্যায় নির্যাতনের কলঙ্ক কিন্তু কখনওই মুছিবে না।