• রণবীর সমাদ্দার
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ডাক পড়েছে কাণ্ডজ্ঞানের

জাতীয়তাবাদ, নাগরিকতা ইত্যাদি প্রশ্নে লড়াইয়ের পথ

TMC
সাফল্য: করিমপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের পরে। ২৮ নভেম্বর। পিটিআই

Advertisement

প্রথমেই বলে রাখা ভাল, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক তিনটি উপনির্বাচনে (করিমপুর, কালিয়াগঞ্জ ও খড়্গপুর কেন্দ্রে) তৃণমূল কংগ্রেসের সাফল্যে আত্মহারা হয়ে এই লেখা নয়। এই জয় নিয়ে কোনও ভাষ্য রচনাও এর উদ্দেশ্য নয়, যদিও এক অর্থে এই নির্বাচনের পরিণামের সঙ্গে কিছু সম্পর্ক এই লেখার আছে। বলা চলে এই উপনির্বাচনগুলি লেখাটির উপলক্ষ।

আরও একটা কথা বলে নেওয়া দরকার। আমি এত দিন যাকে জনপ্রিয়তাবাদী নামে আখ্যা দিয়েছি, তাকেই লোকবাদী রাজনীতি বলতে চেয়েছি। হয়তো বলা যেত জনবাদী, অথবা এত দিন চলে আসা শব্দ জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতি। কিন্তু জনপ্রিয়তাবাদী বললে একটা ধারণা আসে যে, জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কাজকর্ম চলছে এবং যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনপ্রিয়তা বাড়ে, প্রশাসন তা নিয়েই পদক্ষেপ করছে।

এই ধারণায় কোনও সত্যতা নেই এমন নয়। কিন্তু জনপ্রিয়তা তো নানা পথে অর্জন করা যায়, যা একে অন্যের বিরোধী। জনপ্রিয়তাবাদী প্রশাসন সে ক্ষেত্রে কী করবে? তাৎক্ষণিক উত্তর হল, তা-ই করবে, যাতে ভোট বাড়ে। কিন্তু ভোট বাড়বে এবং বার বার বাড়বে, সেই নিশ্চয়তা তো নেই। কুযুক্তির আশ্রয় নিয়ে এ-ও বলা যায়, যাদের ভোট বাড়ে তারা সবাই কি জনপ্রিয়তাবাদী? এই উলটপুরাণের শেষ নেই। বরং এটা বোঝা দরকার যে, জনবাদী রাজনীতি এবং প্রশাসনিকতা এক অন্য বাস্তবতার সন্ধান দেয়। সে দিকে নজর ঘোরানোর জন্যই এই লেখা।

লোকসভায় বাংলায় ভোট-বিপর্যয়ের পরে অনেকেই বলেছিলেন, বাংলায় জনপ্রিয়তাবাদী শাসনের যুগ শেষ হয়ে এল। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বা হয়তো আরও আগেই তার ইতি হবে। দলে দলে কর্মী, নেতানেত্রী বা অনুগামীরা শিবির বদলাবে। নির্বাচনে দেখা যাবে তার অমোঘ পরিণাম।

আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কী ফল হবে, জানি না। ভবিষ্যদ্বাণীতে কাজও নেই। কিন্তু যতটুকু লক্ষ করা যায়, জনপ্রিয়তাবাদী প্রশাসন হৃত জমি পুনরুদ্ধারের মনোবল ও দূরদর্শিতা দেখিয়েছে। প্রশ্ন হল, তা এল কোথা থেকে? সাধারণত জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতিতে দূরদর্শিতা আছে বলেই কেউ স্বীকৃতি দেন না। সেই রাজনীতি লঘু চালে চলে, অদূরদর্শী, হালকা, অনিশ্চিত এবং আশু লক্ষ্যে পদচারণাই তার বৈশিষ্ট্য। এই ধরনের রাজনীতির ওপর ভরসা করা চলে না, এই হল রাজনীতি-প্রাজ্ঞদের মত।

কিন্তু জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির লক্ষ্য যদি হয় লোকবাদ বা লোকহিতবাদ? তা যদি এই রাজনীতির অন্তর্বস্তু নির্ধারণ করে, তার প্রশাসনিক মনোভাবে দৃঢ়তা এনে দেয়, তাকে ঋজু করে তোলে? জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতিকে তার ভঙ্গুরতা নিয়ে যতটা বিদ্রুপ করা চলে, লোকহিতবাদী রাজনৈতিক চিন্তাকে কি ততটা বিদ্রুপ করা যাবে?

লোকবাদী প্রশাসনের একটাই লক্ষ্য: কিসে এবং কী উপায়ে লোকসাধারণের হিত সাধন করা যাবে? ঊনবিংশ শতাব্দীতে লোকহিতবাদ নামে এক আদর্শ বা ধারণা প্রচলিত ছিল। দেড়শো-দু’শো বছর কাল বেয়ে এই লোকহিতবাদ জনপ্রিয়তাবাদী আজ প্রশাসন-দর্শনের রূপ পেয়েছে। এই লোকবাদী বা লোকহিতবাদী প্রশাসনিকতা ভারতের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রূপে আবির্ভূত হয়েছে।

‘দিদিকে বলো’, জেলায় জেলায় প্রশাসনিক সভা, সর্বসমক্ষে প্রশাসনিক আলোচনা ও সমীক্ষা, কন্যাশ্রী, দু’টাকা কিলো দরে চাল, কিসান মান্ডি, সাইকেল বিলি, নতুন স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় খোলা, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং আরও এই ধরনের পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য: বাংলার সামাজিক এবং পার্থিব বা বাস্তব পরিকাঠামো গড়ে তোলা, উন্নত করা এবং প্রসারিত করা। এই সব পদক্ষেপের কিছু ভাল ভাবে ফলপ্রসূ হয়, কিছু মোটামুটি, কিছু ব্যর্থ হয়। কিন্তু পরিকাঠামো উন্নতির অধিকাংশের লক্ষ্য হল লোকহিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্মাণ শিল্প, বৈদ্যুতিন ও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রসার। এর কতটা পরিকল্পিত, কতটা নয়, তা নিয়ে অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা তর্ক করবেন। কিন্তু আশু প্রয়োজন এবং আশু সমস্যার উত্তর পাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা লোকবাদী প্রশাসন করতে থাকে। সাবেক অর্থে দলীয় কাঠামো নেই বলে হয়তো লোকহিতবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুবিধে হয় আশু পদক্ষেপ নির্বাচনে। তাৎক্ষণিকতার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য অবকাশের প্রয়োজন। কিন্তু এটুকু বলা চলে, তাৎক্ষণিকতা, ক্ষিপ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং জনসাধারণের বোধ ও ভাবনা বোঝার ক্ষমতার সঙ্গে লোকবাদের সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কের ভিত্তিই লোকবাদের রাজনৈতিক জীবনকে নানা চড়াই উতরাই সত্ত্বেও দীর্ঘায়িত করেছে। নানা দেশে এই লোকায়ত জনপ্রিয়তাবাদ বার বার মাথা চাড়া দিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র তাকে শেষ করতে পারেনি। এক অন্তর্নিহিত ঋজুতা, এবং লঘুপদক্ষেপে রাজনীতিতে বিচরণের ক্ষমতা লোকবাদী কার্যকলাপের বৈশিষ্ট্য।

একটা বিপরীত উদাহরণ দিলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধে হবে। তবে, আবারও বলি, রাজনীতির সাতকাহন গাওয়া অথবা কোনও রাজনৈতিক দলের নিন্দেমন্দ করা এই উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য নয়।

২০০৮-০৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ ধূমায়িত হল। ছোট এবং মাঝারি শহরে বিক্ষোভ দ্রুত পরিচিত হল ‘রেশন বিদ্রোহ’ নামে। খাদ্যের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তরবঙ্গে পুলিশের গুলিতে ছ’সাত জনের মৃত্যু হল। এ-সবই ঘটল সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের প্রশ্নে তীব্র জনপ্রতিরোধের পটভূমিতে। এবং এ-সবের প্রতিফলন ঘটল এই রাজ্যে ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনে। বামফ্রন্ট পেল ৪২টি আসনের মধ্যে ১৫টি। কিন্তু এই বিপর্যয় বামফ্রন্টের চৈতন্য জাগাতে পারল না। রাজনৈতিক পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক রীতিতেও কোনও পরিবর্তন এল না। বামপন্থী নেতৃত্ব ভাবলেন, বালিতে মুখ গুঁজে রাখলে ঝড় চলে যাবে। এবং ভাবলেন, লোকেরা ভ্রান্তপথগামী, এ বার ভুল সংশোধন করে জনগণের সংগ্রামী প্রতিনিধিদের দিকে মুখ ঘোরাবেন। বুঝবেন, বামপন্থীরাই সঠিক। আজও সম্ভবত তাঁরা ওই তিন বছরের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখেননি, তাঁদের সেই চলৎশক্তিবিহীন অবস্থানের কারণ কী ছিল? কেন তাঁরা পথপরিবর্তন করতে পারলেন না? কেন ক্ষিপ্রতা প্রদর্শনে অসমর্থ হলেন? লোকেদের বোধ ও বুদ্ধি অনুধাবনে কেন তাঁরা অক্ষম?

অন্য দিকে, লোকবাদীদের কী সেই গুণ, যার ফলে তাঁরা লোকেদের বোধ, আকাঙ্ক্ষা, ভয় বুঝতে অধিক সক্ষম, এবং সেই অনুসারে পথ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁদের রাজনৈতিক বিবেকবোধ ঠুনকো আঘাতে বিচলিত হয় না? প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের যে বিশ্বময় পুজো, লোকহিতবাদ বা লোকবাদ যে শুধু তার প্রতি এক সংশয়ীদৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তা নয়, লোকহিতবাদী রাজনীতির ভিত্তিতে লোকবাদীরা মনে করেন, তাঁরাই জনগণ-এর ধারণাকে বাস্তবতায় পরিণত করবেন। লোকহিতবাদীরাই জনগণ। এটাই তাঁদের প্রতিরোধক্ষমতার উৎস।

এই ঘুরে দাঁড়ানোর, প্রয়োজনে পথপরিবর্তনের ক্ষমতার পিছনে সংহতির মনোভাব কাজ করে। প্রচলিত অর্থে নয়, কিন্তু এ-ও এক ধরনের জনসংহতি। দৃষ্টান্ত: তামিলনাড়ু। ক্রমপ্রসরমাণ সামাজিক সেবাপ্রকল্পসমূহ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গুরুত্ব প্রদান, প্রত্যন্ত গ্রামে সেবাপ্রকল্প পৌঁছে দেওয়ার মতো উপযুক্ত প্রশাসনব্যবস্থা— এই তিনটি দিক দাঁড়িয়ে আছে তামিল পরিচিতির এক সংহত সমাজবোধের ওপর। ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধিতা দিয়ে এই বোধের শুরু, এর জন্য অন্য ভাষাভাষীদের ওপর আক্রমণ করতে হয়নি, অন্য প্রদেশ থেকে আগত নির্মাণ-শ্রমিকদের হত্যা করতে হয়নি। কিন্তু ভাষা, শিক্ষা এবং জনকল্যাণ— এই তিনের ভিত্তিতে সেখানে গণতন্ত্র এগিয়েছে। শাসনক্ষমতা হারালেও ডিএমকে বোধবুদ্ধি হারায়নি। কিংবা, এআইএডিএমকে-র প্রয়াত নেত্রী জয়ললিতা এই ক্রমপ্রসরমাণ কল্যাণ প্রকল্পের নীতি বন্ধ করেননি।

পণ্ডিতরা একে জাতীয়তাবাদ, খণ্ডজাতীয়তাবাদ ইত্যাদি নামে আখ্যা দেন। কিন্তু লক্ষণীয়, এবং বাংলার ক্ষেত্রেও সেটা সত্যি, এর মধ্যে দেশপ্রেম আছে, নিজস্ব আঞ্চলিক সত্তার গৌরব আছে। কিন্তু একে কি জাতীয়তাবাদ বলা যাবে? আমার সন্দেহ আছে। স্মরণ করুন সে যুগে বামপন্থীদেরও মুখপত্রের নামগুলো: দেশাভিমানী, দেশহিতৈষী, দেশের কথা। দেশের কথা ভাবার উপাদান লোকহিতবাদের অন্তর্গত। লোকবাদী রাজনীতির ক্ষমতা আছে জাতীয়তাবাদ, নাগরিকতা ইত্যাদি প্রশ্নে উগ্রতার সম্মুখীন হওয়ার। এই সংহত জনসমষ্টি গড়া হল লোকবাদের স্বপ্ন। এ পথে সমস্যা অনেক। পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী হিসেবে আমরা তা জানি। এ নিয়ে সমালোচনা, আলোচনা, চলতে থাকবে। কিন্তু রাজনীতির মূল ধারাকে বুঝতে যেন ভুল না হয়।

কাজেই, উপনির্বাচনের ফল নিয়ে মাতামাতির দরকার নেই। বিন্দুতে সিন্ধুদর্শনের পথ পরিহার করা ভাল, কিন্তু ভাবতেই হবে, কী সেই রাজনৈতিক ভিত্তি, যা লোকবাদীদের এই মানসিক সংগ্রামে রসদ জোগাচ্ছে। লোকহিতবাদী প্রশাসন ও কর্মসূচি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক ও পার্থিব পরিকাঠামোর প্রসার, এই তিন নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলার এক সংহত পরিচয় গড়ে তোলার প্রকল্প। এ পথে এগোতে সমাজবিজ্ঞানের ডিগ্রি লাগে না। বিশ্লেষকদের গভীর রচনারও দরকার হয় না। লাগে, রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন— কাণ্ডজ্ঞান। কাণ্ডজ্ঞানবোধ।

এই কাণ্ডজ্ঞানবোধ থাকলে বিপদে পড়লে পরের কথা শোনা যায়। ভাল উপদেশ কাজে লাগানো যায়। কী পদক্ষেপ করব, তা বাছাই করা যায়। কাণ্ডজ্ঞান কি নিছক ব্যবহারিক বোধ বা বুদ্ধি? একে কি সাধারণ বোধ বলা যাবে? হয়তো এ-সবই এবং আরও কিছু। হয়তো এক প্রবল কৌশলগত বুদ্ধি। দেশের রাজনীতিতে আজ কাণ্ডজ্ঞানের ডাক পড়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, মহানির্বাণ ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপ-এ ডিস্টিঙ্গুইশড চেয়ার অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ফোর্সড মাইগ্রেশন স্টাডিজ়

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন