• দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মহালয়ার ভোরে রেডিয়োই যেন নীলকণ্ঠ পাখি

Mahalaya morning
মহালয়ার ভোরে তর্পণ।

সে ই সময়ে গ্রামে কারও বাড়িতেই রেডিয়ো থাকত না। তবু সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে নদীর দু’পারের চায়ের দোকানে বাজত ‘বিবিধ ভারতী’ কিংবা ‘অনুরোধের আসর’। বছরে কেবল একটি দিন ব্যতিক্রম। সে দিন কাকভোরে রেডিয়ো থেকে বর্ষিত হতো মঙ্গলধ্বনি শঙ্খ। তিন বার। সেই অলৌকিক শাঁখের আওয়াজ টিনের চালের দোকানঘর পেরিয়ে নিথর নদীর আঁধার সবুজ জল ছুঁয়ে খেলে বেড়াত চরাচরে। শরতের ভোরে শিশিরভেজা বাতাস মেখে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র শুরু করতেন, ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জরী।’ অমনি দুলে উঠত কাশবন। দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গেল যে!

গ্রামের পুরুষেরা ততক্ষণে একে একে জড়ো হয়েছেন নদীর পাড়ে। মুখে কয়েক দিনের না কামানো কাঁচা-পাকা দাড়ি। হালকা ঠান্ডায় ধুতির খুঁটে গা-মাথা ঢেকে একদল মানুষ বুঁদ হয়ে শুনতেন দুর্গার সৃষ্টি, রণযাত্রা, বিজয়। চণ্ডীপাঠ আর পঙ্কজ মল্লিকের সুরে গানের পর গান। সুপ্রীতি ঘোষের ‘বাজল তোমার আলোর বেণু’। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘তব অচিন্ত্য’ কিংবা দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের ‘জাগো দুর্গা’।

অসুরবধের আগে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘গর্জঃ গর্জঃ ক্ষণং মূঢ়ঃ মধু যাবৎ পিবাম্যহম...’ উচ্চারণে নুইয়ে থাকাতেই অভ্যস্ত মানুষগুলোও কেমন টানটান হয়ে উঠতেন। দেবীপক্ষের প্রথম সকালের রং তখন কমলা। চোখের সামনে দুর্গার অসুরনাশিনী রূপটা একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে। অসুরদলনের পরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ যত শেষের দিকে গড়াত বীরেন্দ্রকৃষ্ণের গলায় কান্নার ছোঁয়াচ লাগত নদীপাড়ে। কোন ভাঙনের পথে ঢুকে পড়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ যে কার, কোন বিষাদের তারে ঝঙ্কার তুলতেন কে জানে! তখন সব কান্নার মতো!     

এ সব অবশ্য বেশ কয়েক দশক আগের কথা। মানুষ তখনও ‘ডেটা-জিবি’ থেকে বহু দূরে। ফোর জি, ওয়াই-ফাই, ব্লু-টুথ তখনও ভিনগ্রহের শব্দ। স্মার্টফোন, ট্যাবহীন সে এক অন্য পৃথিবী। বাইরের জানলা বলতে ওই রেডিয়ো। শরৎ আসত নীল আকাশে পেঁজা তুলো নিয়ে। শরৎ আসত কাশফুলের সঙ্গে বন্যার আতঙ্ক নিয়ে। আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ বেয়ে আসত ওই একটা ভৈরবী ভোর। তার জন্য সম্বৎসর অধীর আগ্রহ। দেবীর প্রকৃত বোধন যে মহালয়ার ভোরেই! 

রেডিয়োর একটা অনুষ্ঠান নিজেই একটা সম্পূর্ণ উৎসব হয়ে উঠেছে এমন নজির দুনিয়ার কোথাও নেই। মহালয়ার ভোরের সেই ঘোর থেকে আজও বেরিয়ে আসতে পারেন না কেউ কেউ। হয়তো চানও না। তাই এখনও মহালয়ার দু’দিন আগে পুরনো রেডিয়ো নিয়ে দোকানে ছোটেন ওঁরা। ‘তবে কী জানেন, ফি বছর ওঁদের সংখ্যাটা কিন্তু কমে যাচ্ছে’, হাতের তাতালটা নামিয়ে রেখে বিধিসম্মত সতর্কীকরণের ঢঙে কথাটা ছুড়ে দিচ্ছেন সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ দশক ধরে রেডিয়োর সঙ্গে তাঁর ঘর-বসত। দক্ষ কারিগর সুশীল রেডিয়োময় এক ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। মহালয়ার রেডিয়ো নিয়ে কত গল্প যে তাঁর ঝুলিতে লুকিয়ে রয়েছে! 

সেই ছোটবেলায় রেডিয়ো ছিল রূপকথার রাজপুত্র। ‘মুলার’ কোম্পানির রেডিয়োটা থাকত সম্পন্ন গৃহস্থের বৈঠকখানায়। নবটা অন করলে প্রথমে আলো জ্বলে উঠত। সবুজ রঙের। কথা শোনা যেত বেশ কিছুক্ষণ পরে। রেডিয়োর ওই ঘরে ছোটদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। বছরের এই একটা দিন ছাড়া। সে দিন আশ মিটিয়ে দেখে নেওয়া যেত সাহেব কোম্পানির বিলিতি রেডিয়োটাকে। সে ভোর মহালয়ার। অত ভোরেও পড়শিরা চলে আসতেন। ধূপ জ্বলত। আর ঠিক তখন থেকেই শুরু হয়ে যেত পুজো। কয়েক দশক আগে এটাই ছিল বাংলার সর্বজনীন দুর্গোৎসবের চালচিত্র। ওই মায়াবি ভোরে রেডিয়োই যেন হয়ে উঠত নীলকণ্ঠ পাখি। যে মহালয়ার ভোরে কৈলাস থেকে উমার মর্ত্যলোকে যাত্রাশুরুর খবর ছড়িয়ে দিত বীরেন্দ্রকৃষ্ণের মাধ্যমে।

বদলে যাওয়া সময়ে উৎসব তার নিজের ছন্দেই বয়ে চলে। মহালয়ার সকালে নদীর ঘাটে ঘাটে তর্পণের উপচে পড়া ভিড়। তর্পণ-তৎপরতার চিত্র সর্বত্রই সমান। আগের রাতে জরাজীর্ণ ‘পুরোহিত দর্পণের’ ততোধিক ছেঁড়া দু’টি পাতা ‘জেরক্স ও ল্যামিনেশন’ করে তবেই নিশ্চিন্ত হন মাঝবয়সী পুরোহিত মশাই। জলে ভিজলেও তর্পণ-মন্ত্র ঝাপসা হওয়ার ভয় আর থাকল না। যদিও শাস্ত্রজ্ঞ ঋষিকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারল কই ল্যামিনেশন!  

ঘাটের ভিড় থেকে একটু দূরে বুকজলে পুবমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে একমনে তর্পণ করছিলেন প্রবীণ সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত। হঠাৎ কানে এল, ঘাটের সিঁড়িতে বসে এক জন পুরোহিত তাঁর যজমানদের তর্পণ করাচ্ছেন। পুরোহিত মশাই মন্ত্র বলছেন, ‘ব্রহ্মা চিৎপটাং, বিষ্ণু চিৎপটাং, রুদ্র চিৎপটাং, প্রজাপতি চিৎপটাং।’ সমস্বরে তাঁর যজমানেরাও মন্ত্র আউড়ে চলেছেন। পণ্ডিতমশাই হতবাক। থাকতে না পেরে একটু এগিয়ে গিয়ে সেই পুরোহিতের কাছে জানতে চাইলেন, তর্পণের এই মন্ত্র তিনি কোথায় পেলেন? পুরোহিত মশাই গম্ভীর হয়ে জানালেন, এই মন্ত্র তিনি ছোট থেকেই শুনে আসছেন। মৃদু হেসে পণ্ডিতমশাই তাঁকে বললেন, মন্ত্রের ‘চিৎপটাং’ শব্দটা ঠিক নয়। কথাটা ‘তৃপ্যতাম’। জীব, জড়, দেবতা, সকলকে তৃপ্ত করাই তর্পণের মূল তাৎপর্য। তাঁরা যেন তৃপ্ত হন।

তর্পণ আসলে কী? কেন? পণ্ডিতেরা বলেন, তৃপ্তিদানই তর্পণের মূল কথা। যদিও সাধারণের কাছে তর্পণ পাঁচটা আচারসর্বস্ব বাৎসরিক একটা পার্বণ ছাড়া কিছুই নয়। ‘তৃপ’ ধাতু থেকে তর্পণ কথাটির উদ্ভব। অর্থ তৃপ্ত বা প্রীত হওয়া। মহালয়ার সকালে লোকান্তরিত পিতৃপুরুষকেই নয়, পরিচিত বন্ধু-স্বজন থেকে শুরু করে অপরিচিত, এমনকি শত্রুকেও জলদানে তৃপ্ত করাই তর্পণ। দেবতা, ঋষি, নর, তাবৎ জীবকুল, লতা, গুল্ম, বনস্পতি, ওষধি কিছুই বাদ থাকবে না। আসলে সকলকে নিয়ে অনেক বড় করে বাঁচার একটা ভাবনা রয়ে গিয়েছে তর্পণের মধ্যে।  

পূর্বপুরুষদের জন্য মায়া সারা পৃথিবীর সব সভ্যতাতেই রয়েছে। সেই শিকড়ের সন্ধানে নদীজলে দাঁড়িয়ে দু’হাতে জল নিয়ে সূর্যের দিকে মুখ করে যখন বলা হয়, ‘ওঁ আগচ্ছন্ত মে পিতর ইমং গৃহ্নন্ত্ব পোহাজ্ঞলিম’, তখন শুধু যে পিতৃ-পিতামহকে আমন্ত্রণ জানানো হয় তা নয়, সমগ্র অতীত, পূর্বের যাবতীয় প্রাণকেও সশ্রদ্ধ আমন্ত্রণ জানানো হয়। 

মহালয়ার সকালে তর্পণ মানে গঙ্গার ঘাটে স্নানের হুজুগ নয়। না বুঝে মন্ত্র পড়ে নিয়ম মেনে তৃপ্ত হওয়া নয়। বরং এক গভীর অন্তরঙ্গ দর্শনের পাঠাভ্যাস। যেখানে মানুষ তাঁর অতীতের ভিত্তিভূমিকে এক বার ছুঁয়ে দেখার জন্য এক পক্ষ সময় পান। তর্পণ শুধু অতীতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শিকড়ের অভিমুখে ফেরা নয়। তর্পণ আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি চমৎকার অনুশীলনও বটে। 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন