প্রকৃতিদেবী বড়ই চঞ্চলা হইয়াছেন। জুন মাসে দেশ জুড়িয়া বৃষ্টির গড় ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় তেত্রিশ শতাংশ। জুলাইতে দ্রুত পটপরিবর্তন ঘটিয়া গড় হইতে কিছু অধিক বৃষ্টিপাত দেখা যায়। অগস্ট মাসের ৭ তারিখ অবধি স্বাভাবিক হইতে পঁয়ত্রিশ শতাংশ অধিক বৃষ্টিপাত হইয়াছে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু-বাহিত বর্ষা ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করিবার ফলে, জুনের শেষাবধি যাহা এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতিতে ছিল, সেই বৃষ্টিপাত প্রয়োজনের অতিরিক্ত ১.৯ শতাংশ অধিক হইয়াছে। বর্ষার এই চরিত্র অভূতপূর্ব না হইলেও, সচরাচর দেখা যায় না। ২০১২ সালে এই রূপ বদল প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন ভারতবাসী। সেই বৎসর জুন মাসে বিপুল ঘাটতি লইয়া বর্ষার সূচনা হইলেও শেষাবধি তাহা পূরণ করিয়াছিল এক ‘পুনর্জাগরণ’। এই বার আশঙ্কা ছিল, কোনও প্রান্তে বর্ষার শুষ্কতা সেপ্টেম্বর অবধি দীর্ঘ হইলে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্কটের ছায়া দীর্ঘতর হইবে। কিন্তু দ্বিতীয় মোদী সরকারকে বিপাকে ফেলিতে আগ্রহ দেখায় নাই প্রকৃতি। বিলম্বে হইলেও বর্ষা অকৃপণ হইয়াছে। ফলে, আপাতত খরিফ শস্যের চারা রোপণে কিয়দংশে সঙ্কটমোচন সম্ভব হইয়াছে। ৫ জুলাই অবধি গত বৎসরের তুলনায় ২৬.৭ শতাংশ কম পরিমাণ জমিতে চাষ শুরু হইয়াছিল। বর্তমানে সংখ্যাটি ৫.৩ শতাংশে আনা গিয়াছে। অতএব খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা প্রাথমিক ভাবে কিছু প্রশমিত হইয়াছে।

স্বস্তির আড়ালে সঙ্কটটি যেন চাপা না পড়ে— স্বল্পসংখ্যক স্বাভাবিক এবং অধিকসংখ্যক চরম বৃষ্টির দিন, বর্ষার এই অনিশ্চিত চরিত্রটি ক্রমবর্ধমান। জুলাই মাসে কেরল, দক্ষিণ কর্নাটক ও গুজরাতের ন্যায় যে সকল অঞ্চল ঘাটতিতে চলিতেছিল, কয়েক দিনের ভিতরে সেগুলি ‘উদ্বৃত্ত’ বলয়ে প্রবেশ করিয়াছে। বৃষ্টি যথাসময়ে আসে না, আসিলে একেবারে ভাসাইয়া দেয়, আবার কখনও দীর্ঘ বিরতি, এই পরিস্থিতি সামগ্রিক ভাবে চাষির নিকট ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। কেননা ইহার ফলে সমগ্র কৃষিচক্র— বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন ফসল চাষের যে পরম্পরা— তাহা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শস্যের ফলন মার খায়। কেবল জলবায়ু পরিবর্তনকে দোষারোপ করিলে ধরিয়া লইতে হইবে, সকলই সম্ভাবনা এবং অনিশ্চয়তার খেলা। কিন্তু কৃষি জুয়া নহে। তাহাকে অনিশ্চয়তার হাতে সঁপিয়া দেওয়া চলে না। অতএব বিকল্প ভাবিতেই হইবে।

প্রথমত, বর্ষার খামখেয়ালকে ধ্রুবক ধরিয়া পরিকল্পনা করিতে হইবে। এখনও পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের মোট পরিমাণে খুব বেশি ঘাটতি নাই, অতএব বৃষ্টির জল ধরিয়া রাখিয়া চাষে সর্বোচ্চ ব্যবহার করিতে না পারিবার কারণ নাই। ভারতের ১০৭টি বৃহৎ জলাধার মোট ১৬,৬০০ কোটি ঘনমিটার জল সঞ্চিত রাখিতে পারে। ছোট খাল হউক কিংবা চাষের পুকুর, বৃষ্টির জল সঞ্চয়ের কাজ যে কোনও সময়ই হইতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত সেচ-ব্যবস্থাকে কাজে লাগাইয়া সঞ্চিত জলকে চাষের জমি পর্যন্ত লইয়া যাইতে হইবে। ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরশীলতা কমাইয়া, সঞ্চিত বৃষ্টির জলকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সেচ আরও কার্যকর হইলে বৃষ্টির অপেক্ষার প্রয়োজন নাই, তাহাতে  ফসলচক্র ব্যাহত হইবার সম্ভাবনা কমিবে। ইতিমধ্যে ভারতের কৃষি উৎপাদনের বহুলাংশ কাজ রবি মরসুমে হইতেছে। যথাযথ জলসঞ্চয় করিতে পারিলে, বর্ষার আগমন বা শক্তি লইয়া উদ্বেগ কমিবে।