• নিজস্ব প্রতিবেদন
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

প্রশ্ন

Ranjan Gogoi
ফাইল চিত্র

লোকসভা বা রাজ্যসভার অধিবেশনের সময় সভাকক্ষে অবাঞ্ছিত দৃশ্য বিস্তর দেখা যায়, অনভিপ্রেত উচ্চারণও প্রচুর শোনা যায়। কিন্তু রাজ্যসভার পরিচালক তথা উপরাষ্ট্রপতি সংসদের ‘উচ্চতর’ সভায় রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্যকে শপথ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাইতেছেন এবং সাংসদদের একটি বড় অংশ সমবেত কণ্ঠে তাঁহাকে ধিক্কার জানাইতেছেন— এই দৃশ্য ভারতীয় সংসদের ইতিহাসেও বিরল। সুপ্রিম কোর্টের ভূতপূর্ব প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের শপথগ্রহণ পর্বে বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় যে অধ্যায় রচিত হইল, তাহা গৌরবের নহে, লজ্জার। আক্ষরিক অর্থেই লজ্জার— তাঁহার উদ্দেশে বিরোধী সাংসদরা ‘শেম’ ‘শেম’ নামক ধ্রুপদী নিন্দাবাদ নিক্ষেপ করিয়াছেন। শব্দটি কেবল ইংরাজি নহে, তাহার ব্যবহারও ইংরাজ শাসনের উত্তরাধিকার— একেবারে টেমস নদীর কূল হইতে উঠিয়া আসিয়াছে, সংসদীয় ব্যবস্থার মতোই। ভারতীয় পরম্পরায় নিন্দা হিসাবে ‘ধিক’ শব্দটি সুপ্রচলিত। তাহার প্রকৃত অর্থ অপবাদ। বিলাতি ‘শেম’ শব্দটিতে অভিযুক্তের উপর দোষারোপ অপেক্ষা তাঁহার লজ্জাবোধ উদ্রেক করিবার আগ্রহই বেশি কাজ করে। এই নিন্দার মর্মার্থ: যিনি অন্যায় করিতেছেন, তিনি আপন আচরণে লজ্জিত হউন। সাদা বাংলায় বলিলে— ছি!

রঞ্জন গগৈয়ের লজ্জাবোধ জাগ্রত করিবার এই চেষ্টাকে অহেতুক বা অন্যায় বলা চলে না। রাষ্ট্রপতি কেন তাঁহাকে রাজ্যসভার সদস্য পদে মনোনীত করিয়াছেন। কিন্তু মনোনীত হইলেই যে সেই মনোনয়ন স্বীকার করিতে হইবে, এমন মাথার দিব্য কেহ কাহাকেও দেয় নাই। শ্রীযুক্ত গগৈ স্বচ্ছন্দে বলিতে পারিতেন, এই মনোনয়নে তিনি বাধিত, কিন্তু তাঁহার পক্ষে এই পদ স্বীকার করা সম্ভব নহে, কারণ তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, তদুপরি প্রধান বিচারপতি, হিসাবে কাজ করিয়াছেন। সেই আসনে এক বার বসিবার পরে সংসদের সদস্য হইলে আইনে বা সংবিধানে আটকায় না, কিন্তু সংসদীয় শাসনতন্ত্রের নৈতিকতা লঙ্ঘিত হয় না কি? আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের সীমারেখা অপমানিত হয় না কি? শ্রীযুক্ত গগৈ বলিতেই পারেন, তিনি তাহা মনে করেন না। না-ই করিতে পারেন, কিন্তু তাঁহার আচরণ লইয়া এমন প্রশ্ন যাহাতে আদৌ না উঠে, তাহা নিশ্চিত করা তাঁহার নৈতিক দায়িত্ব ছিল না কি? দুর্ভাগ্যের কথা, তাঁহার ঔচিত্যবোধ তাঁহাকে বলে নাই: এই মনোনয়ন স্বীকার করিতে পারি, কিন্তু কেন করিব? লজ্জার অনুষঙ্গটি রহিয়াই গেল।

রহিয়া গেল আরও এই কারণে যে, প্রধান বিচারপতি হিসাবে শ্রীযুক্ত গগৈয়ের কার্যকালেও প্রশ্ন উঠিয়াছে। বিশেষত, অযোধ্যা মামলার রায়ে যে ভাবে বিতর্কিত জমিতে মন্দির নির্মাণের ছাড়পত্র মিলিয়াছে, তাহা বড় রকমের সংশয়ের কারণ। সুপ্রিম কোর্টের বিচার অবশ্যই মহামান্য। সেই বিচারের পিছনে কোনও প্রভাব বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠিতে পারে না। কিন্তু আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রাখিয়াও বিচারের সিদ্ধান্ত লইয়া নীতিগত ভাবে দ্বিমত পোষণ করা যায়। বলা যায় যে, আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের শাসকবর্গ এবং তাঁহাদের সহমর্মীদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বড় সুবিধা হইয়াছে। এই প্রেক্ষাপটটি বাস্তব বলিয়াই আজ, প্রধান বিচারপতির আসন ছাড়িবার চার মাসের মধ্যে রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্য হিসাবে রাজ্যসভায় প্রবেশ করিয়া শ্রীযুক্ত গগৈ কেবল বিরোধী সাংসদদের নহে, দেশের বহু সচেতন নাগরিকের মনেই প্রশ্ন তুলিয়াছেন। শাসক রাজনীতিকরা অতীত দৃষ্টান্ত টানিয়া যে ‘যুক্তি’ খাড়া করিবার চেষ্টা করিয়াছেন, তাহা নিতান্তই ‘তোমরা করিলে আমরা করিব না কেন’ ঘরানার কুযুক্তি। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আত্মপক্ষ সমর্থনে সেই ছেঁদো কথার প্রতিধ্বনি করিবেন না, আশা করা যায়। 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন