১৪ নম্বর হাবশিবাগান লেনস্থিত মেসবাড়ির নিবারণ হরিহর ছত্রের মেলা হইতে একটি মোক্ষম দার্শনিক উপলব্ধি লইয়া ফিরিয়াছিল— এক জন পাপ না করিলে আর এক জনের পুণ্য করিবার জো নাই। যাহাকে বলে, কনজ়ার্ভেশন অব ভার্চু। পুণ্যের নিত্যতা সূত্র। লোকে দুই আনা পয়সা দরে কাক কিনিয়া তাহাদের বন্ধনদশা হইতে মুক্তি দিয়া নিজেও মুক্তি পাইবে— তাহার ব্যবস্থা করিতে মেলায় বেচারা কাকওয়ালা নিজের পরকাল নষ্ট করিতেছিল। মোক্ষের মার্গ এমনই বিচিত্র। নিবারণের সহিত নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাৎ হইবে, সেই সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ, যদিও সে বিরিঞ্চিবাবার সাক্ষাৎ পাইয়াছিল। এখন জন্মদিন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী এক বস্তা প্রজাপতি উড়াইয়া— অর্থাৎ তাহাদের বন্ধনদশা হইতে মুক্তি দিয়া— পুণ্যার্জন তো করিলেন, প্রজাপতিগুলিকে বস্তাবন্দি করিবার পাপটি কাহাকে করিতে হইল? সেই পাপ-পুণ্যের হিসাব যে আদালতে হইবে, সেখানে প্রমাণের অভাবে খালাস পাইবার জো নাই— তবরেজ আনসারি নিজে নিজেই গণপ্রহারে মরিয়া গিয়াছে বলিলে সেই আদালত মানিবে না। কাজেই, প্রধানমন্ত্রীর অর্জিত পুণ্যের সমান ও বিপরীত পাপ নিশ্চয় কাহাকেও করিতে হইল। অন্য কেহ আসিয়া পাপের ভার অক্লেশে বহন করিতেছে দেখিলে দস্যু রত্নাকর মর্মাহত হইতেন, তবে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। ২০০২ হইতে জিএসটি, নোটবাতিল হইতে নাগরিকপঞ্জি, সব পাপের বোঝাই যখন ভগবান বা ভূতে বহিয়া দিল, সামান্য কয়েকটি প্রজাপতিকে বন্দি করিবার পাপ সে তুলনায় আর কী। অতএব, জন্মদিনের উদ্‌যাপনটি চমৎকার হইল। অর্থনীতি মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছে, তাহাতে কী— প্রজাপতি উড়িল তো বটে। 

অবশ্য, জন্মদিন বলিয়াই তাঁহাকে এমন সাজানো-গোছানো সুযোগ দেওয়া হইল, বলিলে সত্যের অপলাপ হইবে। দিনকয়েক পূর্বেই প্রধানমন্ত্রী সাফাইকর্মীসকাশে গিয়াছিলেন। তাঁহাদের পাড়ায়, বসতে নহে। রাজধানীর কোনও এক বাতানুকূল কক্ষের নিপাট সবুজ গালিচার উপর বসিয়াছিলেন পরিচ্ছন্নবস্ত্রপরিহিতা সাফাইকর্মীরা, তাঁহাদের চারিপার্শ্বে ইতস্তত কিছু জঞ্জাল ছড়ানো। জীববিজ্ঞানীরা যেমন ল্যাবরেটরিতে ব্যাকটেরিয়ার নমুনা লইয়া আসেন পরীক্ষা করিতে, প্রধানমন্ত্রীর সম্মুখেও তেমনই সাফাইকর্মীদের নমুনা সাজাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ঠিক যেমন, তিনি ভারতকে ‘স্বচ্ছ’ করিবেন বলিয়া রাস্তায় ঢালিয়া দেওয়া হইয়াছিল কিছু শুষ্ক ডালপালা, পাতা। প্রজাপতির সহিত সাফাইকর্মী ও পথের পাতার যোগসূত্রটি এখন গোটা দেশ জানে: তাহার নাম ক্যামেরা। নির্বাচনপর্ব মিটিবার পর তিনি তপস্যা করিতে গেলে যে ক্যামেরার ঝাঁক তাঁহার পিছু পিছু পৌঁছাইয়াছিল কেদারনাথে। তিনি শরীরচর্চা করিলে যে ক্যামেরা নিষ্পলক তাঁহার দিকে চাহিয়া থাকে, তিনি মায়ের পদস্পর্শ করিতে গেলে যে ক্যামেরা তাঁহাকে মুহূর্তের নিভৃতি দেয় না। দুর্জনে বলে, অমিত শাহ নহেন, প্রধানমন্ত্রীর অভিন্নহৃদয় সত্তাটির নাম ক্যামেরা। কারণ তিনি জানেন, ক্যামেরাগুলি প্রকৃত প্রস্তাবে দেশবাসীর চোখ— ক্যামেরা যাহা দেখায়, দেশবাসী তাহাই দেখে। এবং, যাহা দেখে, তাহাতে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ, নরেন্দ্র মোদী কে, দেশবাসীর জন্য এই প্রশ্নটির উত্তর তিনি নিরন্তর নির্মাণ করিতেছেন, ক্যামেরার মাধ্যমে। তাহাই সত্য, যাহা রচিবেন তিনি। তবে কি না, ছবিগুলি শুধু দেশজ ভক্তজনেই দেখে না, বিশ্বজনেরও চোখে পড়ে। এবং, ছবিগুলি এমনই মেকি, এমনই আন্তরিকতাহীন যে সরল বিশ্ববাসীর চোখে তাহা হাস্যকর ঠেকিবে, আর শুভনাস্তিক বিশ্ববাসী বলিবেন— দেশের মানুষকে বোকা বানাইবার জন্য ধোঁকা। তিনি যাহা নহেন, নিজেকে তেমনটা দেখাইবার প্রয়াস। ছবিগুলির বিষয়ে আর একটু সচেতন হইলে হইত না?