পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে আমার ক’বার মুখোমুখি কথা হয়েছে, সেই সংখ্যাটা হাতে গোনা যায়। তাই আগে মনে হত, তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিশেষ কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই, আমার কাছেও নেই, তাঁর কাছেও না, ৫০ বছর ধরে তিনি তাঁর জায়গায় এবং আমি আমার জায়গায় থেকে যে সঙ্গীত-ভুবনের শরিক ছিলাম, তার কাছেও না।

এখন, ফেলে আসা জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে এবং বিশেষ করে তাঁর সঙ্গে একেবারে গোড়ার দিকের দু’একটা আলাপের কথা ভেবে মনে হয়, আমার ওই ধারণাটি ঠিক ছিল না।

পণ্ডিত রবিশঙ্করের বাজনার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ অবচেতন স্তরে, যখন আমার বয়স দিন চারেক। সেই সময়েই, জ্ঞান হওয়ার আগেই, তাঁর একটি সৃষ্টি আমাকে অনুক্ষণ ঘিরে রেখেছিল। সেটা ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি। পণ্ডিতজি তখন আকাশবাণীর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর। গাঁধীজির মর্মান্তিক মৃত্যুর পরে তিনি একটি রাগ সৃষ্টি করেছিলেন— সারা জীবনে তিনি যে একত্রিশটি রাগ সৃষ্টি করবেন, এটি তার অন্যতম। রেডিয়োয় সারা দিন ধরে মাঝে মাঝেই সেই রাগটি শোনানো হয়েছিল। তার পর, একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল আমার বাবা ডি কে গুপ্তের সংগ্রহ থেকে রেকর্ড শোনার অভিজ্ঞতা। সেই সূত্রেই শুনেছিলাম অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো অর্কেস্ট্রার সঙ্গে পণ্ডিতজির বাজনায় সেই রাগটি, আবার ওই রাগেই পান্নালাল ঘোষের বাঁশিও সেই শৈশবেই শোনা। এই দ্বিতীয় রেকর্ডটি শুনেই অত অল্প বয়সেও আমি সুরগুলিকে আলাদা করে চিনতে পারি এবং ওই রাগটির সৌন্দর্য আমার মনের মধ্যে গাঁথা হয়ে যায়।

তার অনেক বছর পরে পণ্ডিতজির ভাইপো, সুরকার আনন্দশঙ্করের দক্ষিণ কলকাতার নতুন বাড়িতে গৃহপ্রবেশের অনুষ্ঠানে বাজাতে এসেছিলেন তিনি। বেশ বড় আসর। শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার ধ্রুপদী সঙ্গীতের দুনিয়ার বহু গুণী মানুষ। আমিও ছিলাম, সস্ত্রীক। পণ্ডিতজি বাজাতে বসলেন। যন্ত্রের তার বাঁধতে বাঁধতে আমার দিকে তাকালেন। তত দিনে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, 

তাই তাঁকে নমস্কার করলাম। আমার সম্ভাষণ গ্রহণ করে তিনি বাজানো শুরু করলেন। কিন্তু কোন রাগ, সেটা বললেন না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাকে পরীক্ষা করবেন বলেই রাগের নাম অনুক্ত রাখলেন। দেখা গেল, ওখানে উপস্থিত সঙ্গীতজ্ঞরা কেউই সেই রাগটি চিনতে পারছেন না, পরস্পর জানতে চাইছেন। সেই সন্ধ্যায় তিনি সেই রাগটিই বাজিয়েছিলেন, বাবার রেকর্ডে যা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি, ফলে আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিনতে পেরেছিলাম। রাগটির নাম মোহনকোষ।

এ কালে হিন্দুস্থানি ধ্রুপদী সঙ্গীতে যাঁরা সবচেয়ে বেশি নতুন রাগ সৃষ্টি করেছেন, পণ্ডিত রবিশঙ্কর তাঁদের অন্যতম। কিন্তু তাঁর নট ভৈরব বা বৈরাগীর মতো অন্য কিছু কিছু রাগের তুলনায় মোহনকোষ অনেক কম পরিচিত। প্রসঙ্গত বলি, পূর্বোক্ত রাগগুলির পরিচিতি এত বেশি যে নজাকত ও সলামত আলির মতো রীতিমতো নামজাদা শিল্পীরাও প্রথমে সেগুলিকে প্রাচীন রাগ বলে ধরে নিয়েছিলেন।

মোহনকোষ নিঃসন্দেহে পণ্ডিতজির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মালকোষ খুব জনপ্রিয় এবং জমকালো রাগ, কিন্তু এটি যন্ত্রে বাজানো বেশ কঠিন। এই রাগে শুদ্ধ গান্ধার এবং রেখাবের মিশ্রণ ঘটিয়ে মোহনকোষ তৈরি করেছিলেন পণ্ডিতজি। মালকোষের কাঠামোয় প্রধান সুরগুলি হল /কোমল নি, ধা/সা অথবা /কোমল ধা, নি/সা/...। মোহনকোষের চলন হল: /শুদ্ধ গা, রে, গা, মা/শুদ্ধ মা, গা, রে/কোমল নি, ধা/শুদ্ধ গা, মা/, এবং শেষে একাধিক বিকল্পের একটি: /শুদ্ধ মা, গা, রে অথবা গা, রে, গা, মা অথবা রে গা মা/। যখনই পণ্ডিত রবিশঙ্কর মালকোষের /কোমল নি, ধা/সা/ অথবা /কোমল ধা, নি/সা/ ব্যবহার করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে ভারসাম্য আনার জন্য রেখেছেন /শুদ্ধ গা, রে, গা, মা/, আর তার ফলেই সুরটিতে এসেছে গভীর বিষাদের মূর্ছনা, যাকে আমরা মোহনকোষের চরিত্রলক্ষণ বলে চিনতে পারি। মহাত্মা গাঁধীর নির্মম হত্যাকাণ্ডে দেশ যে অতলান্ত বেদনা উপলব্ধি করেছিল, এই বিষাদে যেন তার প্রতিফলন ঘটেছে।

সে দিন ওই আসরে রাগটির নাম না বলে পণ্ডিতজি সমস্ত সঙ্গীতবোদ্ধা এবং ভক্তদের হতবুদ্ধি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার শৈশবের দু’টি লগ্নে মোহনকোষের আবির্ভাবের স্মৃতি আমাকে রাগটি চিনিয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। পরের দিন ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকায় আমি ওই অনুষ্ঠানের যে আলোচনা করেছিলাম, তা পড়ে পণ্ডিতজি অবাক হয়ে যান বলেই আমার বিশ্বাস। এই ঘটনা, আর তাঁর সঙ্গে আমার বাবার এবং সত্যজিৎ রায় ও ‘পথের পাঁচালী’র যোগাযোগ, সব কিছু মিলিয়ে আমি উপলব্ধি করেছিলাম, উত্তর ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত তথা ভারতবর্ষ সম্পর্কে আমার ধারণার উন্মেষ ঘটাতে রবিশঙ্করের সৃষ্টির প্রভাব কতখানি ছিল। অনুরূপ কারণেই রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ‘গান্ধী’ ছবিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এতটা সঙ্গত বলে মনে হয়।

পণ্ডিতজির সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৭৬ সালে। তার চার বছর আগে আমি হিন্দুস্থানি ধ্রুপদী সঙ্গীত নিয়ে লেখা শুরু করেছি। তো, এবিপি গোষ্ঠীর ইংরেজি সংবাদপত্র ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’-এর জন্য তাঁর একটি ছোট সাক্ষাৎকারের দায়িত্ব দেওয়া হল আমাকে। রবীন্দ্রসদনে তাঁর অনুষ্ঠান, সেখানকার সাজঘরে তাঁর সঙ্গে অল্প একটু কথার পরে তিনি জানালেন নির্দিষ্ট দিনে কলকাতা বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, সেখানে কুড়ি মিনিট সময় দেবেন আমাকে।

সাক্ষাৎকারের দিনটা ছিল দোলের দিন। কথা বলতে বলতে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল, আলোচনার বিষয় যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বিস্তারিত হল। নট ভৈরব রাগ সম্পর্কে একটি প্রচলিত দাবির ব্যাপারে আমি সংশয় প্রকাশ করলাম, এবং সেই সূত্রে এই রাগের জন্ম এবং তাতে পণ্ডিতজির ভূমিকা নিয়ে এক আশ্চর্য গল্প শুনলাম।

রাগের বিশ্লেষণে আমি বরাবর ভাতখণ্ডে এবং সুরেশ চক্রবর্তীর পথনির্দেশ অনুযায়ী চলে এসেছি। ফলে, বিলাসখানি টোড়ী রাগে পণ্ডিতজির গুরুভাই উস্তাদ আলি আকবর খানের সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দির অত্যন্ত জনপ্রিয় লং প্লেয়িং রেকর্ডটি নিয়ে আলোচনার সূত্রে আমি প্রশ্ন তুললাম, তিনি এই রাগ বাজানোর সময় /কোমল নি, ধা/শুদ্ধ মা/কোমল গা/পা/ লাগিয়েছেন, অথচ উস্তাদ আলি আকবর খান সর্বদা কোমল ধা/শুদ্ধ মা-এর সঙ্গে /কোমল নি, ধা/পা লাগান, এই তফাতটা কেন। আমার মনে হয়েছিল, এই ধরনের প্রশ্ন তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, কিন্তু (তাঁর বাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তিনি মনে মনে বিরক্ত হয়ে থাকলেও) পণ্ডিতজি আমার কথার খুব বিশদ উত্তর দিয়েছিলেন। এখানে তার মোদ্দা কথাটা বলছি। আমার মতে, এই আলোচনায় তাঁর সঙ্গীতভাবনার একটা মূল সূত্র নিহিত আছে।

সঙ্গীত বিষয়ে পণ্ডিতজির জ্ঞানের সূচনা হয়েছিল তাঁর গুরুর প্রশিক্ষণে, আর তার পাশাপাশি সঙ্গীত সম্পর্কে তাঁর অধ্যয়নে এবং সঙ্গীতের ইতিহাস চর্চায়। কিন্তু ক্রমশ, ব্যক্তিত্বের পরিণতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সঙ্গীতও পরিণত হয়ে উঠল, তিনি যে কোনও রাগকেই আপন অন্তরাত্মার সঙ্গে মিলিয়ে ভাবতে শুরু করলেন, তাঁর বাজনায় তার ছাপ পড়ল।

উত্তর ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের বিশাল এবং রীতিমতো সুনির্দিষ্ট কাঠামোয় এতখানি স্বতন্ত্র শৈলী এবং ব্যক্তিগত ভাবনার প্রয়োগ কী ভাবে সম্ভব হতে পারে? সঙ্গীতের স্বাভাবিক বিবর্তন এবং সামগ্রিকতার ধারণা ও দর্শনের অবস্থান থেকে এই আশ্চর্য ব্যাপারটা পণ্ডিত রবিশঙ্করের অনন্য কীর্তি বলে মনে করি। এর উত্তর দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত দেব। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানের আগে তিনি ধূপকাঠি জ্বালাতেন, তাঁর এই রীতি রীতিমতো প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু তিনি এটা কখনওই নিছক একটা পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করতেন না। উস্তাদ বিলায়েত খানের দেখনদারির সঙ্গে কেউ কেউ এর যে তুলনা করেছেন, সেটাও সম্পূর্ণ ভুল। সঙ্গীতের সঙ্গে পণ্ডিতজির যে পূর্ণ নিবেদনের সম্পর্ক, এই আচারটি ছিল তারই প্রকাশ। এই সম্পর্ক তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে অবধি, তাঁর শেষ আসর পর্যন্ত অবিচল ছিল।

সে দিনের ওই আলোচনা আমার মন ভরিয়ে দিয়েছিল, আমাকে ঋদ্ধও করেছিল। এতটা সময় দেওয়ার জন্য পণ্ডিতজিকে ধন্যবাদ জানালাম, তিনি তা স্মিতহাস্যে গ্রহণও করলেন। কিন্তু আমার নানা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বার বার একটা প্রতিপ্রশ্ন করেছিলেন— আমি কার কাছে ধ্রুপদী সঙ্গীত শিখেছি। আমি বলেছিলাম, আপনাদের সকলের কাছে। শুনে তিনি হেসেছিলেন। আমার মনে হয়েছিল, সেই হাসির দুটো অর্থ। এক, তাঁর প্রভাব কতটা, তা ভেবে তিনি আনন্দ পেয়েছিলেন। দুই, আমার যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, সেটা তাঁকে খুশি করেছিল।

সেই থেকেই তাঁর ভক্তকুলের অনেকেই ক্রমে বাজারে এমন একটা ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যে, আমার যে হেতু কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই, অতএব সঙ্গীত সম্পর্কে আমার মতামতকে, এবং পণ্ডিত রবিশঙ্কর বা তাঁর গুরুভাই উস্তাদ আলি আকবর খানের বাজনা সম্পর্কে আমার সমালোচনাকে পাত্তা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া, এই ভক্তরা বলতেন, আমি আসলে পণ্ডিতজির প্রতিদ্বন্দ্বী উস্তাদ বিলায়েত খানের শিবিরের ধ্বজা বইছি, তাই আমার মত নিরপেক্ষ নয়। এখানে বলে রাখা দরকার, উস্তাদ বিলায়েত খানকে অনর্থক পণ্ডিত রবিশঙ্করের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করার একটা বিভ্রান্তিকর উদ্যোগ চলে আসছিল অনেক দিন ধরেই।

পণ্ডিতজি কেন এই ভুলের নিরসন ঘটাননি, সেটা আমি কোনও দিনই ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। আজ তাঁদের তিন জনের কেউই আর নেই। কিন্তু আমি মনে করি, তাঁরা নিজেদের মধ্যে একটা নিরন্তর টানাপড়েনে জড়িত ছিলেন, যে টানাপড়েন বহুলাংশে তাঁদের ভক্তবৃন্দের তৈরি। তাঁরা যিনি যে ভাবে যন্ত্রটি বাজাতেন, সেই বাজটিই ওই যন্ত্র বাদনের যথার্থ শৈলী বলে প্রচার করা হয়েছিল। এর প্রভাবে যাঁরা ওঁদের বাজনা নিয়ে আলোচনা করতেন, অনুষ্ঠানের সমালোচনা লিখতেন, তাঁরা ওঁদের মাহাত্ম্য, ঘরানা এবং বাজ-এর মধ্যে একটা লড়াই কল্পনা করে নিতেন। এই লড়াইটা ভক্তদের তৈরি, কিন্তু ওই দিকপাল শিল্পীরা নিজেরাও একে কিছুটা প্রশ্রয় দিতেন। আজ, সেই সাক্ষাৎকারের তেতাল্লিশ বছর পরে মনে হয়, এই লড়াই কতটা অবান্তর, কতটা নিষ্ফল ছিল।

এই ফালতু লড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটার অবসান ঘটল, যখন মঞ্চে এলেন গোয়ালিয়র সরোদ ঘরানার প্রবাদপ্রতিম উস্তাদ হাফিজ় আলি খানের পুত্র, উস্তাদ আমজাদ আলি খান। বাবার প্রশিক্ষায় ও প্রভাবে ঋদ্ধ এই শিল্পী একই সঙ্গে পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ আলি আকবর খান এবং উস্তাদ বিলায়েত খানের সঙ্গীতও আত্মস্থ করে গায়কি অঙ্গের অনুরূপ এক অপূর্ব সুরেলা, মনোহরণ এবং ব্যাকরণে নিখুঁত শৈলী তৈরি করলেন। হ্যাঁ, তিনি অংশত নিশ্চয়ই গোয়ালিয়র ঘরানার শরিক, কিন্তু তার সীমা অতিক্রম করে গিয়ে তৈরি করলেন নিজস্ব ঘরানা। যেন শিল্পকলার এক উচ্চতর শক্তির অংশ হিসেবে, সমন্বয়ের বার্তা নিয়ে উস্তাদ আমজাদ আলি খান ধ্রুপদী যন্ত্রসঙ্গীতের বিবদমান শিবিরগুলির মধ্যে একটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করলেন। বিভিন্ন শিবিরের নানা মতের অনুসারীরা তাঁর প্রতিভা, বাজ এবং অনুষ্ঠানের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেন— কে কত বড়, সেই বিচারটাই যেন অবান্তর হয়ে গেল।

আমি নিজে এই লড়াইকে কোনও দিনই কোনও গুরুত্ব দিইনি। আমি ওঁদের বাজনা শুনতাম, সঙ্গীতের নিজস্ব মাপকাঠিতে অনুষ্ঠানের মূল্যায়ন করতাম। কোনও শিল্পী যখন একটা রাগকে তার প্রকাশের চূড়ান্ত সম্ভাবনা অবধি নিয়ে যেতে পারেন, তখন তার রূপ অনেক সীমান্ত অতিক্রম করে সর্বোচ্চ স্তরে উন্মোচিত হয়। রেকর্ডিং স্টুডিয়োয় অল্প কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কিংবা অনুষ্ঠানের আসরে নানা উদ্ভাবনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়ে তাঁদের বাজনা হিন্দুস্থানি ধ্রুপদী সঙ্গীতকে বৃহত্তর বিশ্বে সমাদৃত করে তোলে, জর্জ হ্যারিসন থেকে ইহুদি মেনুহিন অবধি শিল্পীরা তা শুনে মুগ্ধ হন, বিশিষ্ট শ্রোতাদের মনে সেই সঙ্গীত গভীর অনুরাগ সৃষ্টি করে। ‘এক জন ব্যক্তির অহংবোধ’ বা ‘কে আমাদের এক নম্বর সেতারবাদক’ গোছের সব চিন্তা দূরে সরিয়ে রেখে আজ যখন চল্লিশ বছরের ওপর হিন্দুস্থানি ধ্রুপদী সঙ্গীত নিয়ে লেখালিখির অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়, সেই সঙ্গীতকে দুনিয়ার কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই কাজটি তিনিই সবচেয়ে সার্থক ভাবে করেছিলেন, আজ যাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে এই লেখা লিখছি।

এই প্রসঙ্গে বলা দরকার সত্যজিৎ রায়ের কথা। তাঁরও ছিল স্বভাব-সহজ প্রকাশভঙ্গি, আর ছিল সিনেমার ভাষায় অসামান্য দখল। এই কারণেই তাঁকেও অভিবাদন জানিয়েছেন চলচ্চিত্র-দুনিয়ার প্রথম সারির স্রষ্টারা, এবং এর জোরেই তিনি প্রভাবিত করেছেন এ কালের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকারদের। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের বাড়িতে এক সংক্ষিপ্ত আলাপের পরে ক্রমে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে পণ্ডিত রবিশঙ্করের যে সংযোগ গড়ে ওঠে, সর্বোচ্চ স্তরের এক চলচ্চিত্রকার এবং এক সঙ্গীতস্রষ্টার মধ্যে তেমন সংযোগ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আর সেই মেলবন্ধনেই জন্ম নেয় ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ এবং ‘অপুর সংসার’— বিশ্ববন্দিত অপু ট্রিলজির অনন্য নেপথ্যসঙ্গীত।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আজ যখন অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, তখন আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত বোধ করি যে, সত্যজিৎ রায়ের মতোই পণ্ডিত রবিশঙ্করও তাঁর নিজস্ব সৃষ্টির ভুবনে দেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। স্বদেশের কথা ও কাহিনি, তার আদর্শ এবং মূল্যবোধ, এক কথায় স্বদেশের আত্মা তাঁর সৃষ্টিতে এবং তাঁর বাজনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে।