• অর্ঘ্য মান্না
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

নামভূমিকায় মার্চ ২০২০

Jason S. McLellan
জেসন ম্যাকলেলান  

জায়ান্ট কম্পিউটার স্ক্রিন ঘিরে বসে বিজ্ঞানীরা। স্ক্রিনে ফুটে উঠছে একটা ছবি, যা সমাধান করতে পারে বিজ্ঞানের জটিল রহস্য। অবশেষে চোখের সামনে সেই কাঙ্ক্ষিত বস্তু ধরা দিতে সবাই হাততালি দিলেন।

বিজ্ঞান এখন ‘ভিস্যুয়াল’। আণবিক পর্যায়ে ছবি তুলতে সক্ষম বিজ্ঞানীরা। গত বছরই ব্ল্যাক হোলের ছবির সামনে কেটি বাওম্যান-এর উদ্ভাসিত মুখের ছবি ভাইরাল হয়েছে। তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ ছবি তোলার কাজ শেষ হয়েছে এ মাসের শুরুতেই। ওয়েবসাইটে দেখা গিয়েছে সে ছবি। গবেষকরা চিন্তিত মুখে বসে। সামনে স্ক্রিনে একটি প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক ছবি। নোভেল করোনাভাইরাসের বাইরের ক্যাপসিডে আটকে থাকা স্পাইক প্রোটিনের নিখুঁত ত্রিমাত্রিক গঠন। গবেষকদের মধ্যে রয়েছেন এক মধ্যবয়স্ক বিজ্ঞানী— জেসন ম্যাকলেলান। তাঁর দলের তোলা এই ছবিই এই মুহূর্তে বাঁচাতে পারে মানবজাতিকে। 

২০১৯-এর শেষ দিকে কানাঘুষো, চিন-এ এক নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে। পাত্তা দেয়নি বিশ্ব। ২০২০-র শুরু থেকেই খবর, চিনের উহান থেকে ছড়িয়েছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। এর অস্তিত্ব অজানা ছিল না, কিন্তু ভোল বদলে হাজির হয়েছে বলে নাম নোভেল করোনাভাইরাস। রোগের পোশাকি নাম কোভিড-১৯। ৩০ জানুয়ারি করোনা সংক্রমণকে ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন’ ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। মাত্র দু’সপ্তাহেই সংক্রমণ ছড়ায় প্রায় গোটা বিশ্বে। করোনা সংক্রমণকে ‘প্যানডেমিক’ বা অতিমারি ঘোষণা করে ‘হু’।

মধ্য-জানুয়ারিতে করোনাভাইরাসের গোটা জিন সিকোয়েন্স প্রকাশ করে ‘নেচার’ পত্রিকা। দেরি করেননি ম্যাকলেলান। অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে মলিকিউলার বায়োসায়েন্স বিভাগের ছাত্রদের নিয়ে শুরু করেন করোনার বিরুদ্ধে লড়াই। ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করার আগে জানতে হবে, কোথায় আঘাত হানতে হবে।

২০১৬ সালে ‘অ্যানুয়াল রিভিউ অব ভাইরোলজিক জার্নাল’-এ একটি প্রবন্ধ বেরিয়েছিল। সেটা বলছে, করোনাভাইরাসের ক্যাপসিডের বাইরে খোঁচা খোঁচা গ্রাহক প্রোটিন রয়েছে। এগুলি স্পাইক প্রোটিন। নোভেল করোনার জিন-সিকোয়েন্স হাতে ছিলই। চার বছর আগে প্রকাশিত প্রবন্ধ ম্যাকলেলানকে বুঝতে সাহায্য করে, নতুন রূপে আসা করোনাকে আটকাতে ঠিক কোথায় আঘাত হানতে হবে। পুরনো করোনার মতো নোভেল করোনারও বাইরের দিকে থাকতে পারে ছুঁচলো স্পাইক প্রোটিন, যা ভাইরাসকে মানবকোষে প্রবেশে সাহায্য করে।

ম্যাকলেলান ও তাঁর দল প্রথমেই কৃত্রিম ভাবে নোভেল করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন তৈরি করলেন। অবশ্য পুরো কৃত্রিম ভাবে নয়। নোভেল করোনার স্পাইক প্রোটিন পিউরিফিকেশন পদ্ধতিতে আলাদা করে নেওয়াই যেত। কিন্তু তাতে প্রয়োজন হত প্রচুর ভাইরাসের, যা জোগাড় করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় নোভেল করোনার সম্পূর্ণ জিন সিকোয়েন্স থেকে যে অংশটি স্পাইক প্রোটিন তৈরির জন্য প্রয়োজন, সেটিকে আলাদা করে একটি প্লাসমিডে (এক ধরনের চক্রাকার ডিএনএ) ঢুকিয়ে দেন ম্যাকলেলানরা। অতি দ্রুত বিভাজনের সাহায্যে সংখ্যা বাড়িয়ে নিতে পারে এমন কোষে প্লাসমিড প্রবেশ করিয়ে বাড়ানো হয় প্রোটিনের পরিমাণ।

এর পরে প্রোটিনের ছবি তোলার কাজ। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কাজ করে তৈরি হয় নোভেল করোনার স্পাইক প্রোটিনের নিখুঁত ত্রিমাত্রিক ছবি। ছবি তোলার এই ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি পদ্ধতি আবিষ্কারের সুবাদে ২০১৭ সালে রসায়নে নোবেল পেয়েছিলেন জোয়াকিম ফ্রাঙ্ক, রিচার্ড হেন্ডারসন, জ্যাক দুবোশেত। কোনও প্রোটিনের নিখুঁত গঠন জানতে ও চাক্ষুষ দেখতে এই মাইক্রোস্কোপির জুড়ি মেলা ভার।

ম্যাকলেলানদের গবেষণা প্রকাশ করে ‘সায়েন্স’ পত্রিকা। প্রকাশিত হয় রঙিন ছবি: নোভেল করোনার স্পাইক প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠনের রঙিন ছবি। দু’টি তথ্যও উঠে আসে। এক, এই প্রোটিন জোট বাঁধতে পারে এসিই-২ প্রোটিনের সঙ্গে, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবিটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে যার উপস্থিতি বেশি। দুই, এই ত্রিমাত্রিক গঠন অনুসরণে স্পাইক প্রোটিন থেকে তৈরি করা যেতে পারে ভ্যাকসিন।

ম্যাকলেলান জানেন, ব্যাপার মোটেও সহজ নয়। করোনাভাইরাস নিজেকে দ্রুত বদলাচ্ছে। বদল আসতে পারে স্পাইক প্রোটিনেও। তিনি জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সমস্ত বদল অঙ্ক কষে বার করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। জিন সিকোয়েন্সে বদল ঘটিয়ে বিভিন্ন কম্বিনেশনের স্পাইক প্রোটিন তৈরির চেষ্টা করছেন, যাতে বদল ঘটলেও ভ্যাকসিন তৈরির সম্ভাবনা বন্ধ না হয়। বেশির ভাগ গবেষণাগারে তালা ঝুললেও, রাত জাগছে ম্যাকলেলানের ল্যাব।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন