স্বাগত জানানো হাসিটি যাঁর মুখে সর্বদা লেগেই থাকত, সেই সুষমাজি আর নেই। সুষমা স্বরাজ আমাদের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী, প্রাক্তন তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রী, প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, লোকসভায় বিরোধী দলের প্রাক্তন নেত্রী। চল্লিশ বছরের রাজনৈতিক যাত্রায় নানা পদের কয়েকটা। সবাই চিনত সুষমাজি বলেই। ভারতীয় জনতা পার্টি, এবং তার পূর্বসূরি জনসঙ্ঘের উজ্জ্বল মহিলা প্রতিনিধি ছিলেন তিনি, যেমন ছিলেন গ্বালিয়রের প্রয়াত রাজমাতা, বিজয়রাজে সিন্ধিয়া। বিজেপির দুই প্রতিষ্ঠাতা, অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আডবাণীর পরবর্তী নেতাদের মধ্যে অন্যতম।

আমার সঙ্গে সুষমাজির প্রথম দেখা ১৯৯৬ সালে। বিজেপি ১৬১টি আসন জিতে লোকসভায় সবচেয়ে বড় দল হয়ে দেখা দিয়েছে। নিয়মিত বিজেপির ‘খবর’ করি, গোটা কয়েক রিপোর্টারের সঙ্গে পার্টি অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ এসে বললেন, ‘তুমি কী ভাবে এসেছ?’ বললাম, আমার গাড়িতে। উনি বললেন, ‘আমাকে নিয়ে যাবে? আমার গাড়ি নেই।’ আমি লাফিয়ে উঠে গাড়িতে তাঁকে নিয়ে গেলাম বাজপেয়ীর বাড়িতে। 

সেই ছোট্ট কথাটা তিনি কখনও ভুলতে পারেননি। যখন তেরো দিনের সরকার পড়ে গেল, তার পরও আমাদের যোগাযোগ ছিল। এক বার দুর্গাপুজোর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে আমার বাড়িতেও এসেছিলেন। অনেক বছর পর, যখন তিনি মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্মণরেখার অনেকগুলো পেরিয়ে গিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রথম বিদেশমন্ত্রী হয়েছেন, মন্ত্রিসভায় দেশের নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির প্রথম মহিলা সদস্য হয়েছেন, তখনও এক বার জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘পুজো চালিয়ে যাচ্ছ তো?’

২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিদেশমন্ত্রী হিসেবে সুষমা স্বরাজ কত বদলে দিয়েছিলেন বিদেশ মন্ত্রকটাকে। মানুষের থেকে দূরে, সহানুভূতিহীন একটা দফতর মনে করা হত বিদেশ মন্ত্রককে। তিনি তা থেকে বহু দূরে গিয়ে তাকে বন্ধুত্বপূর্ণ, সহজগম্য এক দফতর করে তুলেছিলেন, যা সবার প্রয়োজনে সাড়া দেয়। সারা বিশ্ব থেকে কেউ যদি কেবল টুইটে বা মেসেেজ অভিযোগ জানাতেন, সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পেতেন মন্ত্রক থেকে। সেই বিখ্যাত টুইটটি মনে করুন, ‘যদি আপনি মঙ্গলগ্রহেও থাকেন, আমাদের দূতাবাস আপনাকে সাহায্য করবে।’ 

পূর্বতন সরকারগুলির মতোই, বিদেশনীতি স্থির করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের একটি বড় ভূমিকা ছিল প্রথম নরেন্দ্র মোদী সরকারেও। বিদেশমন্ত্রী হিসেবে সুষমাজি নিজের জন্য যে ‘সুপারমম’ ভাবমূর্তি, বা ‘টুইটার-ইন-চিফ’ ভূমিকা তৈরি করেছিলেন, তার সমালোচনা কম হয়নি। কিন্তু তা থেকে যে ধারণা তৈরি হতে পারে, তাকে নস্যাৎ করেছিলেন। কাজের খুঁটিনাটি বিষয়ে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। বিদেশনীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নানা দেশের মধ্যে যে সব সম্পর্ক, সেগুলির সংবেদনশীলতা খুব ভাল বুঝতেন। বিশদ ভাবে জানতেন তার ইতিহাস, এবং পশ্চাৎপট।

ভারতের বিদেশনীতির একটি বড় সমস্যা— পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে এর লাভ মানেই ওর ক্ষতি। হয় সন্ত্রাসের মোকাবিলা, নইলে কিছুই নয়— এই নীতিকে আরও তীব্র করে তোলে দেশটিকে সব রকম ভাবে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা। মনে পড়ে, এক বার রাষ্ট্রপুঞ্জে সুষমাজি পাকিস্তানের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ভারত যখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আর মহাকাশবিজ্ঞানী তৈরি করছে, তখন পাকিস্তান লস্কর-ই-তৈবা এবং জৈশ-ই-মহম্মদের জন্ম দিয়েছে, সন্ত্রাসীদের শিবির বানাচ্ছে।

বিশ্বদুনিয়ায় উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার দিক দিয়ে ভারতের যে অবস্থান, তাতে অন্য দেশের অমর্যাদা করতে ‌‌এমন শব্দপ্রয়োগ এড়িয়ে যাওয়াই ভাল ছিল। যা-ই ত্রুটি থাক, আর একটি সার্বভৌম দেশকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একঘরে করা, অপমানিত করার চেষ্টা, তার সঙ্গে কোনও ভাবে সংযোগ স্থাপন না করা এক ধরনের ক্ষুদ্রতারই পরিচয়। কূটনীতির সংলাপে তার দরকার ছিল না।

তাঁর অকস্মাৎ মৃত্যুতে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিস্ময় ও বিষণ্ণতা দেখা গেল, তা-ই বুঝিয়ে দেয় যে সুষমাজি এমন মানুষ ছিলেন যাঁর গুণগুলি জনসমাজে আজকাল সহজে দেখা যায় না। সব ব্যবধান ভুলে, রাজনৈতিক বা আদর্শগত বিভেদ মনে না রেখে তিনি অন্যের দিকে হাত বাড়াতে পারতেন।

হিন্দি, সংস্কৃত, উর্দু, ইংরেজি, চারটি ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন। সংসদের ভিতরে ও বাইরে নিজের বক্তব্য স্পষ্ট বলতে পারতেন, কারও প্রতি রূঢ় না হয়েই। অসুস্থতার জন্য ২০১৯ সালের নির্বাচন লড়েননি। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মোদী সরকার ফিরে এলেও তাতে স্থান না পাওয়ায় হয়তো হতাশ হয়েছিলেন। হাসি দিয়ে তা ঢেকে রেখেছিলেন। চলে গেলেন হাসিমুখেই, মাত্র সাতষট্টি বছরে।