E-Paper

দুর্নীতির সর্বগ্রাসী বাস্তুতন্ত্র

এটি বিচ্ছিন্ন কোনও উদাহরণ নয়। এ রাজ্যে যত দুর্নীতির কথা সামনে এসেছে, তার মধ্যে অনেকগুলিই পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

কুন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২০ মার্চ ২০২৬ ০৪:২০
নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, দ্বারকেশ্বর নদীর পাড় ঘেঁষে, যন্ত্র নামিয়ে চলছে নদী থেকে বালিতলা।

নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, দ্বারকেশ্বর নদীর পাড় ঘেঁষে, যন্ত্র নামিয়ে চলছে নদী থেকে বালিতলা।

বছর দশেক আগের কথা। কাঠ পাচার নিয়ে বন দফতরের তৎকালীন এক শীর্ষকর্তা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “এক সময় উত্তরবঙ্গে যাদের কাঠ চুরির জন্য পাকড়াও করেছি, তারাই দেখি এখন নেতা-বিধায়ক হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!” ইঙ্গিত ছিল উত্তরবঙ্গের শাসক দলের এক নেতার দিকে। জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরেও জঙ্গল থেকে দুর্মূল্য কাঠ পাচারের অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে! অরণ্য থেকে কাঠ পাচার করা শুধু সরকারি সম্পত্তি চুরি করাই নয়, পরিবেশের উপরেও কুঠারাঘাত বটে। এ সব অপরাধ ঠেকানো, পরিবেশ বাঁচানো প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু খোদ শাসক দলের জনপ্রতিনিধি যদি অপরাধ চক্রের চাঁই হন, তা হলে রুখে দাঁড়াবে কে?

এটি বিচ্ছিন্ন কোনও উদাহরণ নয়। এ রাজ্যে যত দুর্নীতির কথা সামনে এসেছে, তার মধ্যে অনেকগুলিই পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বস্তুত, পরিবেশে যেমন একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা বাস্তুতন্ত্র থাকে, তেমনই দুর্নীতিরও একটি নিজস্ব কাঠামো থাকে। কয়লা, বালি পাচারের মতো অপরাধে দুর্নীতির সেই কাঠামো ক্রমশ পরিবেশকে গিলে খেতে থাকে। বালি পাচারের কথাই ধরা যাক। গাঙ্গেয় বঙ্গের ছোট-মেজো-বড় নদী থেকে বালি তোলা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, সেই বালি তোলার জায়গা ঠিক করার কথা প্রশাসনের। কিন্তু বাস্তবে মাফিয়া চক্র ইচ্ছেমতো নদীগর্ভ থেকে নির্বিচারে বালি তোলে এবং সেই বালি পাচার হয়ে চলে আসে বিভিন্ন নির্মাণস্থলে।

স্বাভাবিক ভাবেই এই বালির কোনও সরকারি হিসাব থাকে না। বালি থেকে প্রাপ্য রাজস্ব সরকারি কোষাগারে ঢোকে না। তার বদলে ‘লাভের ভাগ’ পৌঁছে যায় নির্দিষ্ট জায়গায়। দুর্নীতির চক্রে বলি হয় নদী এবং পরিবেশ। ইচ্ছেমতো বালি খাদান তৈরি হওয়ায় নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যায়। নষ্ট হয় নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র। একই ভাবে অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেললে শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু এ রাজ্যে নদীতে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলাই স্বাভাবিক নিয়ম। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বরের শেষে হাওড়ার শিবপুরে গঙ্গায় প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ফিক্যাল কলিফর্ম ব্যাক্টিরিয়ার মাত্রা ছিল ২৩ হাজার! কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নিয়মে স্নানের উপযুক্ত জলের ক্ষেত্রে এই মাত্রা হওয়া উচিত প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ২৫০০।

গত কয়েক বছরে এ রাজ্যের কয়লা পাচার নিয়েও কম তদন্ত হয়নি। মাটির তলায় থাকা খনিজ তুলে দেদার পাচার হয়েছে। তার ভাগ কারা কারা পেয়েছেন, সে সব নিয়েও বিস্তর আলোচনা, চাপানউতোর হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ নিয়ে আলোচনা ঊহ্য রয়ে গিয়েছে! মাটির তলা থেকে তোলা কয়লা কোথায় পাচার হয়েছে, কোন কোন কারখানা সে সব কিনেছে— তা নিয়েও কথা হয়নি। পরিবেশকর্মীরা বলেন, রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের বহু গজিয়ে ওঠা কারখানায় এ সব কয়লা বিক্রি হয়েছে। সে সব কারখানার মদতদাতা কারা, তা নিয়েও নানা কানাঘুষো শোনা যায়। তাই কয়লা পাচার নিয়ে যত তদন্ত হয়েছে, চোরাই কয়লা ব্যবহার করা কারখানার বিরুদ্ধে তার সিকিভাগও হয়নি। সে সব কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া অবশ্য পরিবেশে ছড়িয়েছে, বিষিয়েছে নাগরিক ফুসফুসও। কিন্তু দুর্নীতি যদি নৈতিকতার পোশাক পরে ফেলে, তা হলে এ সব বিষ ধোঁয়ার চুল্লি বন্ধ করবে কে?

শুধু ফুসফুস কেন, বছরভর শব্দের যে তাণ্ডব সইতে হয়, তা বন্ধ করার চেষ্টা কি রাজ্য সরকার করেছে? আজ থেকে বহু বছর আগে ডিজে বক্স বন্ধ করেছিল ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল। কিন্তু সেই নিষেধ কাগজে-কলমে রয়ে গিয়েছে। ফি বছর কার্যত নেতা-মন্ত্রী এবং প্রশাসনের মদতেই পাড়ায়-পাড়ায় ডিজে বক্স বাজতেই থাকে। আমজনতার কষ্ট সেই হুল্লোড়ে নগণ্য। এবং উৎসব মানেই ইদানীং বাজির তাণ্ডব। বছরের পর বছর ধরে রাজ্যের আনাচে-কানাচে তৈরি হয়েছে বেআইনি বাজি কারখানা। প্রতি বছরই কোনও না-কোনও বাজি কারখানায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। শ্রমিক তো বটেই, নাবালক-শ্রমিকের মৃত্যুও ঘটে। সে সব কাণ্ডের পর দিনকয়েক প্রশাসনের তৎপরতা, আইনি বাজি কারখানার ক্লাস্টার তৈরির ঘোষণা— এ সব দেখনদারি চলে। কিন্তু কাজ হয় কোথায়? এ সবের পিছনে যে ভোট এবং টাকার অঙ্ক থাকে, তাকে অগ্রাহ্য করে অবৈধ বাজি কারখানাকে আটকাবে কে?

যেমন ভাবে রাজনৈতিক প্রভাব এবং টাকার অঙ্কে কার্যত দখল হয়ে গিয়েছে পূর্ব কলকাতার বিস্তীর্ণ জলাভূমি। মহানগরীর নিকাশি ব্যবস্থা এবং পরিবেশ রক্ষায় এই সুবিশাল জলাভূমির ভূমিকা আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত। এই জলার উপরে নির্ভর করেন বহু প্রান্তিক মৎস্যজীবীও। কিন্তু কী ভাবে এই জলাভূমি দখল করে বেআইনি নির্মাণ হয়েছে, তার উপরে দিস্তা-দিস্তা নথি আদালতে জমা পড়েছে। আদালত বেআইনি নির্মাণ ভাঙার নির্দেশ দিলেও প্রশাসন নড়ে বসেনি। বেআইনি নির্মাণের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ দেখা গিয়েছে নাজিরাবাদ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়। এই সব বেআইনি ভাবে গজিয়ে ওঠা গ্যারাজ, গুদাম, বাড়ি থেকে কোথায় ‘প্রণামী’ পৌঁছয়, সে কথাও খুব একটা অজানা নয়। তাই আদালত একাধিক বার হুঁশিয়ারি দেওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে কোমর বাঁধে না।

একই ভাবে বার বার বলা সত্ত্বেও রাজ্যে প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগের রমরমা চলতে থাকে। বর্ষায় নিকাশি নালা আটকে এলাকা জলমগ্ন হলে নেতা বা জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের ‘সচেতনতার অভাব’-এর কথা বলেন। তার পর জল নেমে গেলে সে সব কথা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। অথচ পরিবেশ রক্ষার জন্য আস্ত একটি সরকারি দফতর এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ নামে সরকারি সংস্থা আছে। গত পনেরো বছরে এই দফতর এবং পর্ষদের কী হাল, তা অবশ্য সামান্য খতিয়ানেই স্পষ্ট।

একদা পরিবেশ দফতরের দায়িত্ব যিনি পেয়েছিলেন, তিনি তখন একাধারে কলকাতার মেয়রও ছিলেন। পরিবেশ বাঁচানোর দায় তিনি কতটা নিয়েছিলেন বলা মুশকিল, তবে তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প ছিল রামসার তালিকাভুক্ত পূর্ব কলকাতা জলাভূমির উপর দিয়ে উড়ালপুল নির্মাণ। বঙ্গবাসীর সৌভাগ্য, সেই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। গত পাঁচ বছরে তিন বার পরিবেশমন্ত্রী বদলেছে। তবে পরিবেশ বাঁচাতে দফতরের মন্ত্রী যারপরনাই সক্রিয় হয়েছেন, এমন ‘অভিযোগ’ কেউ করেনি।

বাকি রইল দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ। একদা বাম আমলে এই সংস্থা দূষণ রোধে মোটের উপরে সক্রিয় ছিল। অন্তত নালিশ করলে বহু ক্ষেত্রেই সুরাহা হত। রাজনৈতিক চাপ সামলে পর্ষদের কর্তারা কড়া পদক্ষেপও করতেন। কিন্তু বর্তমানে বৎসরান্তে পরিবেশ দিবস পালন বা কালীপুজো-দেওয়ালিতে কন্ট্রোল রুম খোলা ছাড়া পর্ষদের কাজকর্ম নিয়ে তেমন কিছু শোনা যায় না। পর্ষদের কর্তারা অবশ্য মাঝেমধ্যে ঘনিষ্ঠ মহলে অনুযোগ করেন, যে হারে পরিবেশের উপরে চাপ বেড়েছে তার সমানুপাতে পর্ষদের কর্মী বাড়েনি। সে সব কথা মেনে নিলেও প্রশ্ন ওঠে, গত পনেরো বছরে রাজ্যের কোন দূষণের ক্ষেত্রে কঠোর হয়েছে পর্ষদ? এই নিষ্ক্রিয়তার পিছনে কি রাজনৈতিক চাপ ও আনুগত্য? না কি সর্ষের মধ্যেই ঢুকে পড়েছে দুর্নীতির ভূত?

শেষে আরও এক বার ফিরে যাই, উত্তরবঙ্গের কাঠ পাচারের ঘটনায়। সেই পাচার রুখতে গিয়ে এক অফিসারের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলা যাক। কাঠ পাচার, বন্যপ্রাণী পাচার রুখতে একের পর এক ডেরায় হানা দিচ্ছিলেন এক ফরেস্ট অফিসার। ভেবেছিলেন, দফতর, সরকার ভাল কাজের পাশে দাঁড়াবে। এ ভাবেই এক দিন এক প্রভাবশালীর বাড়িতে হানা দিয়ে চোরাই কাঠ উদ্ধার করেছিলেন। বনকর্মীদের আক্ষেপ, প্রশাসন সে দিন চোরাই কাঠ মজুত করা ‘প্রভাবশালী’র পাশেই দাঁড়িয়েছিল। ওই অফিসারের ‘শাস্তিমূলক’ বদলি সামগ্রিক ভাবে বনকর্মীদের কাছে বিশেষ বার্তাবহ ছিল।

দুর্নীতির বাস্তুতন্ত্র কি তবে পরিবেশের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Biodiversity

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy