Advertisement
E-Paper

মুখের আঁচলখানি

কিছু লোক এত দিন প্ল্যাকার্ড লইয়া অফিস যাইতে পারিত না, এই বার তাহাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস একেবারে মুখে লাগিয়া থাকিবে, কমিক্সের চরিত্রের ন্যায়।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২০ ০০:১৩
ছবি: পিটিআই।

ছবি: পিটিআই।

মানুষ ওস্তাদ প্রাণী। যেই সে দেখিয়াছে মুখাবরণ নামক অস্বস্তিকর ব্যাপারটি বাধ্যতামূলক হইল, তখনই বস্তুটিকে ফ্যাশনদুরস্ত করিতে উঠিয়াপড়িয়া লাগিয়াছে। রাজনৈতিক নেতানেত্রী তো নিজ দলের চিহ্ন সাঁটিয়া বক্তৃতা দিতেছেনই, বহুজাতিক সংস্থাগুলিও নিশ্চয় অবিলম্বে তাহাদের লোগো বিখ্যাত ক্রিকেটার বা ফিল্মস্টারের আননাঞ্চলে ঝলকাইয়া, মানুষকে সেই ‘ব্র্যান্ডেড’ মাস্ক পরিতে লালায়িত করিবে। কিছু লোক এত দিন প্ল্যাকার্ড লইয়া অফিস যাইতে পারিত না, এই বার তাহাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস একেবারে মুখে লাগিয়া থাকিবে, কমিক্সের চরিত্রের ন্যায়। অবশ্য ‘বন্দুকের নলই শক্তির উৎস’ বা ‘মার্ক্সবাদ সর্বশক্তিমান কারণ ইহা সত্য’ এত দীর্ঘ স্লোগান, বিশাল মুখমণ্ডল ব্যতীত এইগুলি ধরিবে না, আপাতত ‘গাছ লাগান’ বা ‘হিটলার বদ’ লইয়াই কাজ চালাইতে হইবে। ভারতীয় বস্ত্র সংস্থাগুলি নামিয়া পড়িয়াছে বিভিন্ন বাহারি বদনবস্ত্র প্রস্তুত করিতে, কেহ সুতি দিয়া বানাইতেছে, নিশ্চয় খুঁজিলে মসলিনও পাওয়া যাইবে, কেহ তাহাতে দিতেছে ফুল-ফুল প্রসন্ন ছাপ, কেহ লোকসংস্কৃতি হইতে নিষ্কাশিত নকশা। কোনও সংস্থা চশমাধারীর জন্য বিশেষ আকৃতির মাস্ক প্রস্তুত করিতেছে, যাহাতে চশমার কাচ ভাপগ্রস্ত না হয়। কেহ নজর দিতেছে শিশুযোগ্য, বিশেষ ভাবে প্রস্তুত বস্ত্রের মুখবাসের প্রতি, যাহাতে শিশুরা লেহন করিলেও তাহাদের দেহে ক্ষতিকর উপাদান না প্রবেশ করে। কেহ শরীরচর্চাকারীদের জন্য এমন বস্ত্রে বদনপট্ট বানাইতেছে, যাহা বহু স্বেদাক্রান্ত হইয়াও থাকে দুর্গন্ধহীন। আর বিবাহের সময় তো বর বা বধূ (বা অভ্যাগত) পোশাকের সহিত বিসদৃশ মুখচ্ছদ পরিতে পারে না, ফলে ধুতি শাড়ি জামাপ্যান্টের সহিত সমঞ্জস, দামি ও অলঙ্কার-মর্যাদাবান অভিজাত মুখপ্রচ্ছদ চালু হইল বলিয়া। অনেকের মতে, নানাবিধ মাস্ক চালু হওয়া ভীত সমাজের পক্ষে জরুরি, কারণ সেগুলির সহিত অসুখের ত্রাসের অনুষঙ্গ প্রত্যক্ষ নহে।

মুশকিল হইল, আদি কাল হইতে, মানুষ অন্যের অভিব্যক্তি বুঝিবার জন্য মুখের দিকে তাকাইয়া থাকিয়াছে। অনেকেই মনে করেন, মানুষের কথায় তাহার যে মনোভাব ব্যক্ত হইতেছে, মুখভাব লক্ষ করিলে তাহার অধিক সত্য পড়িয়া লওয়া যায়। ওষ্ঠসঞ্চালন না দেখিতে পাইলে বধির ব্যক্তিরা কেমন করিয়া কথা বুঝিবেন, অতএব স্বচ্ছ মুখবস্ত্র প্রয়োজন— সে মৃদু আন্দোলন তো চলিতেছেই, কিন্তু বক্তা ওষ্ঠাধর লুকাইলে যে কোনও শ্রোতারই কথা বুঝিতে অস্বস্তি হইবে, আজন্ম অভ্যাসের ব্যত্যয় ঘটিবার ফলে এমনকি ইহাও বুঝিতে অসুবিধা হইবে, বাক্যটি সে সদর্থে বলিতেছে না ব্যঙ্গাত্মক ভাবে। মৃদু হাসি বহু প্রকার, মানুষ কেবল সুখেই হাসে না, লজ্জিত হইলেও হাসে, ব্যথিত হইলেও। তাই মুখভঙ্গি যাথাযথ না বুঝিলে, জনসংযোগ ব্যাহত হইবে, কথার মর্ম সম্যক বোধগম্য হইবে না। অনেকে তর্ক করিয়াছেন, বহু মুসলিম মহিলা এমন পোশাক পরিয়া থাকেন, যাহাতে মুখমণ্ডলের মধ্যে কেবল চক্ষুদ্বয় দৃশ্যমান থাকে, তাঁহাদের কি কথোপকথনের কালে চিন্তাভাবনা আদানপ্রদানে কোনও অসুবিধা ঘটে? অনেকে বলিয়াছেন, মুখ আচ্ছাদিত থাকিলে মানুষ নিজের কথা বুঝাইতে অন্য শরীরভাষাগুলি অধিক স্পষ্ট করিবে, হাত নাড়াইবে কাঁধ ঝাঁকাইবে ভ্রুভঙ্গি করিবে পূর্বের তুলনায় অধিক মাত্রায়, আর শ্রোতাও এইগুলি লক্ষ করিতে দ্রুত অভ্যস্ত হইয়া যাইবেন। রাষ্ট্রের অবশ্য মুখ ঢাকা থাকায় খুবই অসুবিধা হইবে, কারণ সদ্য কিছু দেশ প্রযুক্তির সাহায্যে নাগরিকের মুখাবয়ব পড়িয়া নজরদারির প্রখর জগৎ গড়িয়া তুলিতে অত্যুৎসাহী হইয়াছিল।

অন্য দিকে অতিমারি রুখিতে বিশ্বব্যাপী অসংখ্য প্লাস্টিকের মাস্ক নির্মাণের ফলে, সমুদ্রে দূষণ বাড়িয়া চলিয়াছে, কারণ লোকে তো মাস্কগুলিকে ফেলিয়া দিতেছে, সঙ্গে ফেলিতেছে দস্তানা ও স্যানিটাইজ়ারের বোতল। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, এই বার ভূমধ্যসাগরে জেলিফিশের অপেক্ষা মাস্ক অধিক হইয়া যাইবে। এমনিতেই প্রতি বৎসর সমুদ্রে ১৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক জমা হয়, জলজ প্রাণীরা অনেকে তাহা খাইতে যায় ও অসুস্থ হইয়া পড়ে, অনেকে মারা যায়। নিজেদের মুখ ঢাকিয়া পরিত্রাণ পাইতে গিয়া অন্য প্রাণীর শ্বাস রোধ করিয়া মারিয়া ফেলার ব্যবস্থা করিলে, মানুষের সচেতনতার দফারফা হইবে না কি? কবি দুঃখ করিয়া বলিয়াছিলেন, মুখ ঢাকিয়া যায় বিজ্ঞাপনে। আজ মানুষের সুখ ঢাকিয়া যায় মুখচ্ছদে। নূতন উচ্চারণে কবি বা দ্রষ্টার ওষ্ঠ নড়িতেছে কি না, মাস্কের আড়ালে বুঝা দায়।

যৎকিঞ্চিৎ

‘কালো’ কথাটাকে ‘খারাপ’ অর্থে ব্যবহার করা যাবে না, মত জোরালো হচ্ছে। অর্থাৎ কক্ষনও বলা যাবে না, ‘জর্জ ফ্লয়েড হত্যার দিনটি মানবেতিহাসে কালো দিন’, বা ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’। ‘কালো? তা সে যতই কালো হোক’-এর মধ্যে যে ‘কালো তত ভাল নয়’ নিহিত, তা শনাক্ত করতে হবে। তালি পাবে শুধু গুচ্ছ শ্যামাসঙ্গীত (‘কালো মেয়ের পায়ের তলায়...’) এবং তারাশঙ্করের ‘কবি’-গান, ‘কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে’।

Coronavirus Health Covid-19
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy