Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৬ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

বিচার বিভাগের উপর রাজনীতির এই ছায়া শঙ্কিত করে

এমনই কি হওয়ার কথা ছিল

মনে পড়ছে, দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী সংবিধান তৈরি হওয়ারও আগে দেশ শাসনের ভার হাতে নিয়েছিলেন যখন, একটা কথার উপর সারা ক্ষণ জোর দিতেন— ইনডিপেন্ড

সেমন্তী ঘোষ
০৮ মে ২০১৮ ১৬:৩৪

কয়েকটা মাত্র দশক। তার মধ্যে কতই না পাল্টে গেল দেশটা। কতখানি দূরে সরে গেলাম আমরা আদর্শ, নীতি, চিন্তার দিক দিয়ে। দ্রুত এবং ক্রমাগত পিছিয়ে চলার পালা এখন, ভাবার পালা— তা হলে একেই কি বলে সভ্যতা? এমনটাই কি হওয়ার কথা ছিল? স্বাধীনতার পর দেশটা যেমন করে গড়তে চাওয়া হয়েছিল, সেটার মধ্যে কি তা হলে বড্ড বেশি আদর্শবাদিতা থেকে গিয়েছিল? বাস্তব কি তাই আজ পদে পদে বুঝিয়ে দিচ্ছে, ভারতের মতো দেশে অত সুমহান আদর্শ টিকতে পারে না? কয়েক দিন ধরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ইমপিচমেন্টের খবর পড়তে পড়তে এই সব চিন্তা মাথায় ঘুরছে।

মনে পড়ছে, দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী সংবিধান তৈরি হওয়ারও আগে দেশ শাসনের ভার হাতে নিয়েছিলেন যখন, একটা কথার উপর সারা ক্ষণ জোর দিতেন— ইনডিপেন্ডেন্ট জুডিশিয়ারি বা স্বাধীন বিচার বিভাগ। গণতন্ত্রের তিন স্তম্ভের মধ্যে বিচার বিভাগ সতত স্বতন্ত্র, তার গৌরব, মর্যাদা, দায়িত্ব— সবই অন্য দুই বিভাগের থেকে অনেক বেশি। আর সেই ‘বেশি’ গৌরব ও মর্যাদা কতখানি রক্ষা করা সম্ভব, তার উপরই নির্ভরশীল গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। নির্ভরশীল বাকি দুই বিভাগের কর্মক্ষমতাও। তাই নেহরুর জরুরি বার্তা: বিচারকদের উপর যাতে শাসন বিভাগ বা আইন বিভাগের কোনও আংশিক নিয়ন্ত্রণও না থাকে, যাতে তাঁরা সম্পূর্ণ নিজস্ব বিবেচনায় কাজ করতে পারেন, যে বিবেচনা হবে সব ক্ষুদ্রতা, দলীয়তা, সংকীর্ণতা মুক্ত, কেবল সাংবিধানিক নীতির সুরক্ষাই হবে যে বিবেচনার একমাত্র উদ্দেশ্য এবং বিধেয়।

বৃথা যায়নি তাঁর কথা। সংবিধানসভা সে দিন সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়— এমন ভাবে রাজ্য স্তরের আদালতে এবং সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতিদের নিয়োগ করা হবে, যাতে তাঁরা অন্য দুই বিভাগের নিয়ন্ত্রণাতীত হন, এবং এমন ভাবে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হবেন, যাতে তাঁর মর্যাদার মাত্রা দাঁড়ায় প্রায় প্রেসিডেন্টের পর পরই। জনপ্রতিনিধিরা বিচারপতিদের সরাতে তো পারবেনই না, তাঁদের কাজকর্ম নিয়ে প্রতিনিধিসভায় বসে আলোচনা গবেষণাও করতে পারবেন না।

Advertisement

এবং এত কিছু বলার পর, নেহরুর বক্তব্যে ছিল আর একটি ভারি জরুরি শর্ত। বিচারপতিদের গুরুত্বের পাশে তাঁদের দায়িত্বের শর্ত। ‘‘সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও বলতে হবে যে, এ একটা বিরাট দায়িত্বের কাজ... বিচারপতিদের কেবল এই কাজে অসামান্য দক্ষ হলেই চলবে না, গোটা দেশ যাতে তাঁদের অসামান্য দক্ষ বলে স্বীকার করে, সেটাও দেখতে হবে (ইট ইজ ইম্পর্ট্যান্ট দ্যাট দিজ জাজেস শুড নট ওনলি বি ফার্স্ট-রেট, বাট শুড বি অ্যাকনলেজড টু বি ফার্স্ট-রেট ইন দ্য কান্ট্রি।) চারিত্রিক দৃঢ়তার দিক দিয়ে তাঁরা হবেন অভ্রান্ত, এমনই দৃঢ় ও মর্যাদাময়, যাতে তাঁরা প্রয়োজনে শাসন বিভাগের বিরুদ্ধেও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারেন।’’

আশ্চর্য ঠেকে এখন এ সব শুনলে। মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদর্শবাদ। আর সেই বিস্ময় থেকে এ-ও মনে হয়: প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলির মধ্যে কতখানি সত্যতা আছে, ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা ঠিক হল না ভুল হল, জানুয়ারি মাসে যখন সুপ্রিম কোর্টের চার বিচারপতি প্রেস কনফারেন্স ডেকে প্রধান বিচারপতিকে লেখা তাঁদের অভিযোগপত্র জনসমক্ষে দেখালেন, সেটা ঠিক কাজ ছিল না কি ভুল— এ সবই বিতর্কযোগ্য সন্দেহ নেই, কিন্তু ওগুলি সবই ছোট ছোট বিতর্ক। আসল বড় বিতর্কটা হল, নেহরুর দেশের মূল নীতিটা থেকে কি আমাদের এখনকার দেশ সরে এসেছে? আজ কি বিচার বিভাগ বাকি বিভাগগুলির থেকে ততখানি দূরবর্তী? রাজনীতির সর্বভেদী দুনিয়াদারির মধ্যে কি ইতিমধ্যে বিচার বিভাগেরও একটা স্থান হয়ে যায়নি?

তা না হলে, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট কেনই-বা এত প্রবল আকারে বিরোধী রাজনীতির অংশ হয়ে উঠবে? কিংবা ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবে বিচারপতির বিরুদ্ধে যে অভিযোগসমূহ, সেগুলো খণ্ডন করতে কেন এমন কোমর বেঁধে নামবে সরকার পক্ষ? দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদসমূহের অন্যতম পদটিরও আজ আর কোনও রাজনীতি-ঊর্ধ্ব সম্মান নেই? প্রধান বিচারপতির নিরপেক্ষতার প্রশ্নটাও তবে আজ রাজনৈতিক দড়ি-টানাটানির অংশ? ভয় হয়, একটা স্বীকৃতির স্তরেও হয়তো বা চলে এসেছে বিষয়টি। সসম্মান প্রশ্ন তুলতে ইচ্ছা করে, মাননীয় প্রধান বিচারপতি চাইলে কি এই রাজনৈতিক ক্লিন্নতা থেকে নিজের পদটিকে মুক্ত করে নিতে পারতেন না? ইমপিচমেন্টের কথাবার্তা শুরু হওয়া ইস্তক একটু সরে দাঁড়াতে পারতেন না? এখনও পর্যন্ত তিনি কিন্তু অবিচলিত। তাঁকে কেন্দ্র করে দেশে এমন একটি ঐতিহাসিক সঙ্কট উপস্থিত হয়েছে, অথচ এখনও প্রকাশ্যে তাঁর অটল নিঃস্পৃহতা।

নিঃস্পৃহতা বা নিষ্ক্রিয়তা শুনতে নিরীহ, কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর। ইমপিচমেন্টের দিনটি ভারতীয় সাংবিধানিক গণতন্ত্রের কৃষ্ণতম দিন, বলেছেন আইনজ্ঞ ফলি নরিম্যান। এত গুরুতর একটি পদক্ষেপ করার জন্য তিনি বিরোধী সাংসদবর্গকে ভর্ৎসনা করেছেন। যথেষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও এমন অভিযোগে চিফ জাস্টিসকে ইমপিচ করা হল কেন, এই তাঁর প্রশ্ন। কিন্তু তাঁর প্রশ্নটাকে একটু ঘুরিয়ে অন্য যুক্তিও দেওয়া যায়। প্রমাণ যথেষ্ট কি না, সেটা তো বিচারেই প্রমাণিত হওয়ার কথা। কিন্তু যেখানে এমন সাঙ্ঘাতিক অভিযোগ উঠল, এগিয়ে গেল, এবং এত দূর এসে ইমপিচমেন্টে পরিণত হতে পারল— সেই পরিস্থিতিটার মধ্যেও কি একটা বিপজ্জনক বার্তা নেই? কী সেই বাস্তবের চেহারা, যেখানে এত দিক থেকে এত রকম অভিযোগ ধেয়ে এসে এত হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে? কেমন সেই বাস্তব, যেখানে শীতের দুপুরে রাজধানী শহরের উদ্যান প্রাঙ্গণে চার বর্ষীয়ান সম্মাননীয় বিচারপতি এত গুরুতর একটি চিঠি প্রচারমাধ্যমের সামনে নিয়ে আসেন, এবং মন্তব্য করেন যে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করেও কোনও মীমাংসার আলো না পেয়ে জনতার দরবারে তাঁদের অভিযোগটি নিয়ে আসতে হয়েছে? এমনই কি হওয়ার কথা ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের অভ্যন্তরীণ হালচাল? প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে চিঠি কিংবা ইমপিচমেন্ট, কিছুই তো শেষ পর্যন্ত ‘কোনও এক ব্যক্তির প্রতি মন্তব্য’ মাত্র নয়, এ তো দেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ বিন্দুটির সূত্রে বিচার বিভাগের অনিরপেক্ষ কাজকর্মের অভিযোগ? প্রমাণিত হোক না হোক, অভিযোগটুকুই তো সুপ্রিম কোর্ট তথা গোটা বিচার বিভাগের প্রতি ‘পাবলিক ট্রাস্ট’ বা জন-আস্থা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে! একের পর এক ঘটনায় সেই আশঙ্কা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই যে ইন্দু মলহোত্র সুপ্রিম কোর্টে বিচারক হিসেবে গৃহীত হলেন কিন্তু (উত্তরাখণ্ডে রাষ্ট্রপতি শাসন বানচাল করার কারণে) বিজেপির অতিশয় অপ্রীতিভাজন উত্তরাখণ্ডের চিফ জাস্টিস কে এম জোসেফ-এর নামটি গ্রাহ্য হল না, সেটাও কি এই একই আশঙ্কা তুলে ধরছে না? সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে এত পরিব্যাপ্ত আশঙ্কা আর অনাস্থার মধ্যে এই দেশ তবে গণতন্ত্রের গর্ব করবে কী করে?

অথচ এই গর্ব সহজে ছেড়ে দেওয়ার বস্তু নয়। আমরা যেন মনে রাখি, এ দেশের সুপ্রিম কোর্ট তো বটেই, বহু উচ্চ আদালতই কিন্তু এক আশ্চর্য উচ্চতায় পৌঁছনোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, বহু মামলায়, বহু দিন ধরে। উদাহরণ ভূরি ভূরি। একটি ক্ষেত্র মনে করতে পারি এখানে। ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সম্পত্তির পরিমাণ দাখিলের দাবিতে একটি মামলা হয় দিল্লি হাইকোর্টে। তাতে রায় যে বিচারকদের সম্পূর্ণ ‘ট্রান্সপারেন্সি’ বা স্বচ্ছতার পক্ষেই যায়, এটা তত বড় কথা নয়। আসল বড় কথা হল, সেই মামলার রায়ে নিজের বিষয়ে বিচার বিভাগের কী প্রত্যয় ও প্রতিশ্রুতি বেরিয়ে এসেছিল। তিন-বিচারক-সংবলিত বেঞ্চ বলেছিল: যে কোনও এক জন অসৎ বিচারক নিজের অসততা দিয়ে কেবল নিজেকে অসম্মানিত করেন না, গোটা জুডিশিয়াল সিস্টেম-এর সম্মান নষ্ট করেন। প্রায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল সেই অসামান্য আত্মপ্রত্যয়ী রায়টিতে: বিচারক যখন বিচার করেন, তাঁর নিজেরও বিচার হয়। সূর্যালোক নিজেই পারে, সব অশুচি পুড়িয়ে দিতে— ‘সানলাইট ইজ দ্য বেস্ট ডিসইনফেকট্যান্ট।’

ওই রায়ে যে কথাটা ছিল না, আমরা সেটাও এই প্রসঙ্গে এক বার স্মরণ করে নিতে পারি। সূর্যালোক যে সূর্যালোকই, চন্দ্রালোক নয়, তা নিয়ে জীবজগতে কারও কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকে না, নিজের প্রভাই তার নিজের গৌরবের স্বীকৃতি— ঠিক যে কথাটা বলতে চেয়েছিলেন নেহরু। বলতে চেয়েছিলেন, বিচারপতিদের নিরপেক্ষতা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা হবে এমন স্বতঃসিদ্ধ, সর্বজনস্বীকৃত, কোনও প্রশ্ন উঠতেই পারবে না তা নিয়ে।

নেহরুর এই প্রত্যয় যে ভারতের বিচার বিভাগে প্রতিফলিত হতে আমরা কখনও দেখিনি, এমনটা তো বলতে পারি না! দেখেছি, শ্রদ্ধা করেছি, বহু রকম প্রেক্ষিতে। একটা নাছোড় আস্থা তাই থেকেই যাচ্ছে। আশা থাকছে, তাঁরাই নিশ্চয় পারবেন, কোনও না কোনও ভাবে নিজেদের এই সঙ্কট থেকে বার করে আনতে।

আরও পড়ুন

Advertisement