Advertisement
E-Paper

ভারতেরও কি দরকার ঘানার চাবুক

গায়ের রং ময়লা তো কী, বাজারে ফর্সা হওয়ার ক্রিম উতরে দেবে ভাগ্য। আফ্রিকা সহ এশিয়া ও প্রাচ্যের দেশে এমনটাই ধারণা। কিন্তু আফ্রিকার দেশ ঘানা গত অগস্ট মাস থেকে নিষিদ্ধ করেছে ফর্সা হওয়ার ক্রিম। কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে’-র মতন লোকায়ত জ্ঞান বা ‘কালো হরিণ চোখ’-এর মতো রোম্যান্টিক কবি-বাণী আমাদের কিছুই প্রভাবিত করেনি। আমরা, গড়পড়তা ভারতীয়রা ফর্সা হতে চেয়ে বিজ্ঞাপনে ভুলে সেই ধরনের ক্রিমের বিরাট বাজার তৈরি করে দিয়েছি।

শাশ্বতী ঘোষ

শেষ আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০১৬ ০০:০৫

কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে’-র মতন লোকায়ত জ্ঞান বা ‘কালো হরিণ চোখ’-এর মতো রোম্যান্টিক কবি-বাণী আমাদের কিছুই প্রভাবিত করেনি। আমরা, গড়পড়তা ভারতীয়রা ফর্সা হতে চেয়ে বিজ্ঞাপনে ভুলে সেই ধরনের ক্রিমের বিরাট বাজার তৈরি করে দিয়েছি।

কিন্তু আফ্রিকার দেশ ঘানা, যেখানে নাকি প্রতি দু’জনে এক জন এই ক্রিম ব্যবহার করেন, সেখানে সেই ফর্সা হওয়ার ক্রিম বিক্রি এই অগস্ট মাস থেকে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। এই ক্রিমে থাকে হাইড্রোকুইনন নামে একটি রাসায়নিক, যা নির্ধারিত মাত্রার থেকে বেশি থাকলে ত্বকের ক্ষতি করে। ইতিমধ্যেই আমেরিকা, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর অস্ট্রেলিয়ায় নির্ধারিত মাত্রার থেকে বেশি হাইড্রোকুইনন থাকলে সে ধরনের ক্রিম খোলা বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ।

আর ভারতে, এই ধরনের ক্রিম বিক্রি নিষিদ্ধ করা তো দূরস্থান, এই সব ক্রিমের বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে, এই ক্রিম ব্যবহার করলে মেয়েরা পাবে স্বপ্নের রাজপুত্তুরকে, ছেলেরা পাবে বহু বান্ধবী। অথচ, আমরা সে সব বন্ধ করতে পারি না। যেমন বন্ধ করতে পারি না বিয়ের পাত্রপাত্রীর খোঁজ করতে গিয়ে গায়ের রঙের উল্লেখ। এবংএই আমরাই আমাদের চেয়ে আরও কালো মানুষদের মারি, অবজ্ঞা করি, নাক সিঁটকাই, তখন আমাদের মধ্যেকার আরেক ধরনের জাতপাত হিংস্র ভাবে তার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

এক বার, অভিনেত্রী নন্দিতা দাশের ছবি একটি বিখ্যাত দৈনিকে, কম্পিউটারের কারসাজিতে এতটাই ফর্সা করে প্রকাশিত হল যে, তাঁর পরিচিতেরা তাঁকে ফোন করতে শুরু করেন যে সেই ছবির মানুষটি তিনিই কি না! নন্দিতা কাগজকে তাঁর বিরক্তি জানালে তারা ক্ষমা চায়, আর নন্দিতা শুরু করেন ‘কালো-ই সুন্দর’ বলে প্রচার। আমাদের দেশে প্রায় সব্বাই গায়ের রংটাকে ফর্সা করতে চায়— ক্রিম ব্যবহার করে হোক বা যন্ত্রের কারসাজিতে। এখানে ফর্সা মানে অভিজাত, ফর্সা মানে শাসক, ফর্সা মানে ধনী, ফর্সা মানে ভাল পাত্র—বিশেষত এক জন মেয়ে যা চাইতে পারে, তার সমাহার। ফর্সা এতটাই কাম্য, কারণ আমাদের গ্রীষ্মপ্রধান দেশে প্রাকৃতিক কারণেই বেশির ভাগ মানুষ ‘তত’ ফর্সা নন।

আফ্রিকার দেশগুলোতে, আমাদের দেশ বা বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালের মতোই, বা তার থেকেও বেশি ফর্সা হওয়ার ক্রিমের রমরমা।

এই ক্রিমের হাইড্রোকুইনন এমনকী সাত দিনের মধ্যে অনেক ফর্সা দেখতে করতে পারে। কোনও রকম দাগ হলে চর্মরোগের চিকিৎসকরা এটা সীমিত ভাবে ব্যবহার করতে বলেন। কিন্তু রোজকার ক্রিমে এটি যদি নির্দিষ্ট পরিমাণের থেকে বেশি থাকে, তা হলে ত্বকের নানা রকম ক্ষতি করতে পারে, এমনকী কালো ছোপ পর্যন্ত হতে পারে। তাকে আর ঠিক করা যায় না, কারণ এই ক্রিমের হাইড্রোকুইনন বা মার্কারি ত্বকের উপরিভাগকে ব্লিচ করে দেয়, যা আর সারানো সম্ভব নয়। আর শুধু ত্বকের ক্ষতি নয়, এই ধরনের রাসায়নিকযুক্ত ক্রিম দীর্ঘকাল ব্যবহার করলে লিভার বা কিডনিরও ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু এই ক্ষতির কথা বৃহত্তর জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে না, কারণ ত্বকে ব্লিচ ব্যবহার করে ক্ষতি হয়েছে যাঁদের, তাঁরা নিজেদের খুবই সঙ্গোপনে রাখেন, ফলে, যে মানুষ এই ধরনের ক্রিম ব্যবহার করছেন বা করতে চান, তাঁরা এর ‘উপকারিতার’ প্রচারকে ছাপিয়ে ‘অপকারিতার’ খবরে পৌঁছোতে পারেন না।

এত ক্ষতি সত্ত্বেও আফ্রিকার নানা দেশে, নাইজিরিয়ায় ৭০%, টোগোতে ৬০%, সেনেগালে ২৭% মেয়ে এই ধরনের ক্রিম ব্যবহার করেন। তার মধ্যে অজ্ঞতার কারণ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে শাসক-সাহেবদের মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, মেয়েদের মধ্যে নিজেদের চেহারা নিয়ে বিষম ঘৃণা আর আত্মবিশ্বাসের অভাব, চেহারাই যেন একমাত্র পরিচয়— সেই তাড়নায়, ফর্সা বা হালকা রঙের বন্ধুবান্ধবী বা সন্তান আকাঙ্ক্ষা করা। এমনকী বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রথম সারির দেশ, নেলসন ম্যান্ডেলার দক্ষিণ আফ্রিকাতেও ৪৫% মেয়ে এই ধরনের ক্রিম ব্যবহার করেন। সারা আফ্রিকায় গড়ে ৬০% মেয়ে এই ধরনের ক্রিম ব্যবহার করেন। সমীক্ষা বলছে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সাবান, চা আর টিনের দুধের পর এটি হল চার নম্বর দ্রব্য, যা প্রতিটি পরিবারে ব্যবহার হয়। কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেল বায়োলজির শিক্ষক লেস্টার ডেভিডস এই হালকা রং-প্রীতিকে বলছেন পোস্ট-অ্যাপারথেড ইনফিরিয়রিটি ডিসর্ডার (পেড) বা বর্ণবৈষম্য-উত্তর নিকৃষ্টতার রোগ।

মেয়েরাই যখন এই ক্রিম ছেলেদের তুলনায় বেশি অনুপাতে ব্যবহার করেন, তখন এর মধ্যে শুধু শাসকের ‘মতো’ হতে চাওয়া নয়, পুরুষরা মেয়েদের যে রকম দেখতে চায়, সেই মাপকাঠিতে তৈরি হয়ে ওঠার কাহিনিও থাকে। আর এই বিশ্বাস এক প্রজন্মে তৈরি হয় না। চারপাশে মানুষ দেখে, রং একটু হালকা হলেই ভাল কাজ, ভাল বিয়ে, সমাজে ‘ওঠা’র একটু বেশি সুযোগ। তাই আজ একটু ভাল বাঁচার জন্য কাল কী মূল্য দিতে হবে, সেটা ভাবা কঠিন হয়ে ওঠে।

আফ্রিকাতেই শুধু এই ফর্সা হতে চাওয়ার চাপ রয়েছে তা নয়, রয়েছে এশিয়ার প্রায় সব দেশেই। এমনকী জাপান আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতেও এই ক্রিমের চাহিদা ভালই। সমীক্ষা-সংস্থা এ সি নিয়েলসন এক তথ্যে বলছে, শুধু ফর্সা হওয়ার ক্রিমের বাজার ২০১২ সালে ছিল ৪৩ কোটি ডলারের, আর তা ১৮% হারে প্রতি বছর বাড়ছে, যা এ দেশে কোকা কোলা-র বাজারের থেকেও বেশি। এ দেশে বিজ্ঞাপন দেখায়, গায়ের রং ময়লা মানেই সেই মেয়ের চাকরি পাওয়া কঠিন, পাত্র পাওয়া দুঃসাধ্য, সমাজে গ্রহণীয়তা খুব কম। যদিও বিজ্ঞাপনের বক্তব্যে কী থাকবে না থাকবে, তা স্থির করার জন্য তৈরি অ্যাডভার্টাইজমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া ২০১৪ সালে তার নির্দেশিকায় জানিয়েছে, গায়ের রং কালো হলে তাকে কোনও ভাবে ছোট করে দেখানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও তো সে রকম বিজ্ঞাপন হামেশাই দেখা যায়। অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের দেশ যা করে দেখাতে পারে, আমরা ফর্সা হওয়ার ক্রিম কেনাবেচাকে বন্ধ করতে পারি না।

বিজ্ঞাপন আমাদের যে-সব গপ্পো বলে, তার মধ্যে দিয়ে সমাজের নানা বিভেদ মিলেমিশে যায়। বাজার চলতি সবচেয়ে নাম করা ফর্সা হওয়ার ক্রিমের বিজ্ঞাপনটির কথা ধরা যাক। এক অবসরপ্রাপ্ত বাবা আর্থিক অসচ্ছলতায় শোক প্রকাশ করেন— কেন যে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর একটি ছেলে নেই। তাঁর ‘কালো’ মেয়েটি প্রতিজ্ঞা করে যে, তাকে ‘ছেলের মতো’ হতেই হবে। তাই সে ওই ফর্সা হওয়ার ক্রিমটি মেখে বিমানসেবিকার কাঙ্ক্ষিত কাজটি পেয়ে বাবার ‘ছেলে’ হয়ে ওঠে!

তবে, এখন এই ফর্সা হওয়ার ক্রিম ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক ধরনের লিঙ্গসাম্য লক্ষ করা যায়। এমনকী শাহরুখ খান পর্যন্ত এগিয়ে বলেন, যখন তিনি ফর্সা হওয়ার ক্রিমটির সন্ধান পাননি, তত দিন তিনি এক জন সাধারণ মানুষ ছিলেন। খোঁজ পাওয়ার পরেই তিনি এক জন সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছেন। এই ভাবে দক্ষিণ গোলার্ধের মানুষেরা এক সারিতে বসে যাই। এক ধরনের ঔপনিবেশিক শাসন আর শোষণের উত্তরাধিকার নিয়েও আমরা রাস্তায় কালো মানুষদের দেখলে আমাদের থেকে নিচু, অবমানব ভাবি। ভারতেও কি দরকার ঘানা-র চাবুক?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy