Advertisement
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
Editorial News

মানসিকতাই বদলাচ্ছে না, আইনে লাভ হবে কী ভাবে?

কাঠুয়া কাণ্ডে উত্তাল হয়েছে গোটা দেশ। তাতেও অপরাধে ছেদ পড়েনি। মর্মান্তিক খবর এসেছে সুরাত থেকে। অপরাধের তালিকা ক্রমশ বাড়তে থেকেছে। এই তালিকা আরও দীর্ঘায়িত হবে যদি সন্তোষ গাঙ্গোয়ারের মতো দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিবর্গও এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করতে থাকেন।

কী বোঝাতে চাইলেন গাঙ্গোয়ার? ছবি: সংগৃহীত।

কী বোঝাতে চাইলেন গাঙ্গোয়ার? ছবি: সংগৃহীত।

অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০১৮ ০০:৪৪
Share: Save:

কঠোর আইন এল ধর্ষণ-যৌন নিগ্রহের বিরুদ্ধে। সরকার বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতর হবে পদক্ষেপ। কেন্দ্রের পদক্ষেপকে বহুলাংশে স্বাগতও জানানোও হল। কিন্তু শুধু প্রশাসনিক তৎপরতাতেই অপরাধ কমবে না। সামাজিক এবং ব্যক্তিগত স্তরেও মানসিকতায় বদল জরুরি। ধর্ষণ-যৌন নিগ্রহ বা শিশুর উপর যৌন পীড়ন যে আসলে একটি সামাজিক ব্যাধি, এগুলো যে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

কাঠুয়া কাণ্ডে উত্তাল হয়েছে গোটা দেশ। তাতেও অপরাধে ছেদ পড়েনি। মর্মান্তিক খবর এসেছে সুরাত থেকে। অপরাধের তালিকা ক্রমশ বাড়তে থেকেছে। এই তালিকা আরও দীর্ঘায়িত হবে যদি সন্তোষ গাঙ্গোয়ারের মতো দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিবর্গও এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করতে থাকেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সন্তোষ গাঙ্গোয়ারের মত, ভারতের মতো এমন সুবিশাল দেশে ‘দু’একটা ধর্ষণের ঘটনা’ অস্বাভাবিক নয়। কী বোঝাতে চাইলেন গাঙ্গোয়ার? যৌন পীড়নের এই সব ঘটনা আসলে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন বিষয়, এ নিয়ে বেশি মাথাব্যথার কারণ থাকা উচিত নয়— কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্য অনেকটা এ রকমই।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কঠোরতম পদক্ষেপেরই পক্ষে। ১২ বছরের কমবয়সিকে ধর্ষণে এ বার থেকে ফাঁসি, এমন বন্দোবস্তই করেছে সরকার। ধর্ষণ প্রসঙ্গে বা অন্যান্য সামাজিক সমস্যার বিষয়ে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিবর্গ যে ধরনের অনাকাঙ্খিত মন্তব্য বা বিশ্লেষণ দিচ্ছেন, তাঁর বিরুদ্ধেও প্রধানমন্ত্রী সতর্কবার্তা দিলেন। যে কোনও বিষয়ে মুখ খোলার প্রয়োজন নেই, জনপ্রতিনিধি হলেই যে কোনও বিষয়ে বিশেষজ্ঞের মতামত পোষণ করার অধিকার জন্মায়, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই, এমন কোনও মন্তব্য করা চলবে না, যা অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অঙ্গীকারকে লঘু করে— নিজের দলের জনপ্রতিনিধিদের এমন বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সমাপতনও অদ্ভুত। যে সময়ে এই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, প্রায় সেই সময়েই তাঁর মন্ত্রিসভার এক সদস্য বলতে চাইছেন, যৌন পীড়নের এই সব ঘটনা নেহাতই বিচ্ছিন্ন এবং সংখ্যায় নগণ্য। বলতে চাইছেন, এ সব ঘটনা নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর দরকার নেই।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধিটা থেকে কী ভাবে মুক্তি পাওয়া যাবে, ভেবে দিশাহারা হয়ে পড়ছে গোটা দেশ। নতুন করে আইন বানাতে হচ্ছে। দণ্ডবিধি বদলে প্রাণদণ্ডের বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে। কিন্তু সেই সময়েই এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর লঘু মন্তব্য। ঘৃণ্য অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকারটা কতখানি ধাক্কা খায় এই সব মন্তব্যে, সে ধারণা সম্ভবত সন্তোষ গাঙ্গোয়ারদের নেই। আসলে নিজের পদের প্রতি সুবিচার করতেই শেখেননি এই রাজনীতিকরা। যে পদে তিনি রয়েছেন, সেখানে থাকলে কতটা দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি, সেই উপলব্ধি সম্ভবত গাঙ্গোয়ারের নেই। অতএব সমাজ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকবে, এমনটাও আশা করা কঠিন।

আরও পড়ুন
ধর্ষণ বন্ধ করা যাবে না, বললেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী

আমাদের প্রত্যেককে বুঝতে হবে, জঘণ্য এক সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে আজ। এ ব্যাধি নতুন নয়, কিন্তু আজ তা ক্রমশ মারীর আকার নিতে চাইছে। তাই লড়াইয়ের অঙ্গীকারটা আরও দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কোনও এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অবুঝের মতো মন্তব্য করে দিচ্ছেন, কোনও রাজ্যের মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধিরা বেলাগাম আচরণ করছেন আর লড়াইটা বার বার দুর্বল হচ্ছে। দায়িত্বশীল পদে থাকা রাজনীতিকদের প্রতিটি দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যই কিন্তু ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে। কঠোর আইন বানালেই অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ হয়ে যায় না। আইন আইনের জায়গায় থাকে, অপরাধ অপরাধের জায়গায়। আইনের উপযুক্ত প্রয়োগ যখন ঘটে, তখন আইন প্রয়নণের সুফলটা প্রতিফলিত হয়। কিন্তু প্রতিটি দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য এবং কার্যকলাপ সেই ফলিত সুফল থেকে আমাদের বঞ্চিত করবে। প্রভাবশালী রাজনীতিকরা যত বার এমন বেলাগাম আচরণ করবেন, তত বারই অপরাধগুলো লঘু হিসেবে প্রতিভাত হবে কোনও কোনও মহলে, প্রশাসন প্রভাবিত হবে, কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ ধাক্কা খাবে।

দোহাই, আর দুর্বল করবেন না এই লড়াইটাকে। এই ভয়ঙ্কর প্রবণতাকে নির্মূল করতেই হবে। সেই লক্ষ্যে এই মুহূর্ত থেকে আরও অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া জরুরি। অতএব নিজেদের লাগামটা কখন কখন জরুরি হয়ে পড়ে, সেটা নিজেরাই চিনে নিন।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE