দুর্ভাগা এই দেশ, যেখানে অষ্টমবর্ষীয়া এক বালিকার নৃশংস ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের মামলার রায় প্রকাশিত হইবার পূর্বেই সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়া চলে একাধিক রাজ্যে। দুর্ভাগা এই দেশ, যেখানে কাঠুয়া মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবীর দুর্দম সাহস, বিচারকের ব্যতিক্রমী তৎপরতার কথা ছাপাইয়া রায় প্রকাশের দিন মুখ্য হইয়া দাঁড়ায় ধর্ষিতা বালিকার ধর্মসংক্রান্ত আলোচনা। প্রশ্ন উঠিতে থাকে, সেই মামলায় ধর্ষিতা বালিকাটি ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান বলিয়া যে নাগরিক সমাজ প্রতিবাদে গর্জাইয়া উঠিয়াছিল, পরবর্তী নৃশংসতাগুলির শিকাররা হিন্দু হওয়াতেই কি নাগরিক সমাজের মুখে রা নাই? দুর্ভাগা সেই দেশ, যেখানে একটি দুই বৎসরের বালিকার নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডও মুহূর্তে রাজনৈতিক তরজার বিষয় হইয়া উঠিতে পারে। কিন্তু, এই দুর্ভাগ্যই যখন ভারতের বাস্তব, তখন প্রশ্নগুলিকে এড়াইয়া যাওয়া শুধু ভুল নহে, অন্যায় হইবে— গণতন্ত্রের প্রতি অন্যায়, নাগরিক সমাজের নিরপেক্ষতার প্রতি অন্যায়। প্রথমেই স্পষ্ট ভাষায় বলা প্রয়োজন, নৃশংসতার রংবিচার হয় না। কাঠুয়ার ধর্ষণ যেমন তীব্র ভাবে নিন্দনীয় ছিল, আলিগড়ের হত্যাকাণ্ড বা উত্তরপ্রদেশ-মধ্যপ্রদেশের ধর্ষণ-খুনের ঘটনাগুলিও ঠিক তেমনই নিন্দনীয়। ধর্ষিতা, নিহত বালিকাদের অথবা নরাধম অপরাধীগুলির ধর্মীয় পরিচয় কী, তাহা এই নিন্দার পথে বিবেচ্য হইতেই পারে না। এবং, রাজনীতির প্রয়োজনে যতই অস্বীকার করা হউক, সত্য হইল, কাঠুয়ার ঘটনায় নাগরিক সমাজ যতখানি বিচলিত হইয়াছিল, আলিগড়ের ঘটনাতেও ঠিক ততখানিই হইয়াছে। কোন ধর্মের মানুষ কতখানি মনুষ্যেতর হইতে পারে, তাহা বিচলনের মূল কারণ নহে— ভারত নামক দেশটি কোন সর্বনাশের পথে চলিতেছে, নাগরিক সমাজকে তাহাই ভাবাইয়া তুলিয়াছে। এ কোন দেশ, কোন ভবিষ্যৎ আমরা রচনা করিতেছি, যেখানে একটি দুই বৎসরের শিশুও প্রতিহিংসার শিকার হইতে পারে! কোনও ধিক্কারই এই অপরাধের নিন্দায় যথেষ্ট নহে।

কিন্তু, একই সঙ্গে বলা প্রয়োজন, কাঠুয়ার ঘটনার সহিত আলিগড়ের ঘটনার ফারাক আছে। বস্তুত, নির্ভয়া-কাণ্ডও কাঠুয়া ধর্ষণ-হত্যার সহিত তুলনীয় নহে। তাহার কারণ ধর্ষিতা ও ধর্ষকের, নিহত ও ঘাতকের ধর্মীয় পরিচয়। সেই পরিচয় অবশ্য যতখানি ধর্মের, তাহার অধিক রাজনীতির। ধর্মকে আয়ুধ করিয়া লওয়া রাজনীতির। কাঠুয়ার বালিকাটি ধর্মে মুসলমান ছিল, জাতে বকরওয়াল-গুর্জর। যাহারা ধর্ষণ করিয়াছিল, তাহারা হিন্দু। পরিচিতিগুলি নেহাত সমাপতিত নহে। এই ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের পিছনে ছিল বকরওয়ালদের ভয় পাওয়াইবার একটি পরিকল্পিত ছক। যাযাবর এই জনজাতির লোকেরা জম্মুতে পাকাপাকি ঠাঁই পাতিবে এবং তাহাতে জম্মুর জনসংখ্যায় মুসলমানদের অনুপাত বাড়িবে, এ হেন একটি আশঙ্কা ছড়ানো হইয়াছিল। বকরওয়ালদের এই ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকাইতেই মন্দিরে তুলিয়া লইয়া গিয়া গণধর্ষণের পর হত্যা করা হইয়াছিল মেয়েটিকে। আলিগড় হত্যা বা নির্ভয়া-কাণ্ডে এই ধর্মীয় পরিচিতির আখ্যান ছিল না। আলিগড়ের নিহত বালিকাটি হিন্দু এবং সন্দেহভাজন অপরাধী ধর্মে মুসলমান হওয়ার পরেও সেই হত্যা নিছক ব্যক্তিগত প্রতিহিংসারই ছিল। কাজেই, কাঠুয়া-কাণ্ডের প্রতিবাদে ধর্মের প্রসঙ্গ আসা যেমন স্বাভাবিক, আলিগড়ের নিন্দায় সেই প্রসঙ্গ না আসাও ততখানিই স্বাভাবিক। যাঁহারা প্রশ্ন করিতেছেন, ক্ষেত্রবিশেষে ধর্মের প্রসঙ্গ আসিতেছে বা আসিতেছে না কেন, তাঁহারা হয় ঘটনাগুলির চরিত্রগত ফারাক বোঝেন না, বা জানিয়া-বুঝিয়াও গুলাইয়া দিতে চাহেন। প্রবণতাটি বিপজ্জনক। যাঁহারা না ভাবিয়াই ‘ধর্ষণের ধর্মবিচার হয় না’ বলিতেছেন, তাঁহারা ভারতীয় গণতন্ত্রের উপকার করিতেছেন না। নাগরিক সমাজের নিরপেক্ষতারও নহে। যে প্রশ্ন রাজনীতির— ধর্মীয় রাজনীতির— তাহাকে সেই ভাবে দেখাই বিধেয়।