ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করার পর কোচবিহারের কাটামারি গ্রামের বাইসনটিকে চিলাপাতার জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু বন দফতর জানিয়েছে, জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার আগেই ওই পুরুষ বাইসনটির মৃত্যু হয়। একে বাইসনের হৃদ্‌যন্ত্র দুর্বল, তার উপর প্রচণ্ড গরমে দৌড়দৌড়ির ধকল নিতে না পারায় বাইসনটির মৃত্যু হয়েছে বলেই অনুমান করা হয়েছে।

পরিবেশপ্রেমীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত বছর কোচবিহারেরই গোপালপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় লোকালয়ে চলে এসেছিল একটি বাইসন। সেটিকেও বনকর্মীরা ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করেন। শেষ পর্যন্ত জলদাপাড়ায় জঙ্গলে ছাড়ার জন্য বাইসনটিকে নিয়ে রওনা হওয়া গেলেও পথেই সেটির মৃত্যু হয়। বছরদু’য়েক আগে কোচবিহারের চিলকিরহাট গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেও জঙ্গল ছেড়ে ঢুকে পড়েছিল এক বাইসন দম্পতি। একটি মাদি ও একটি পুরুষ বাইসনকেও ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করা হয়েছিল। ওই দু’টি বাইসনেরও চিলাপাতার জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার পরে মৃত্যু হয়েছিল। কয়েকবছর আগে গরুমারা জঙ্গল লাগোয়া কুমলাই গ্রামে ঢুকে পড়ার জেরে ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করা দু’টি বাইসনও জঙ্গলে ফেরানোর পথে মরে গিয়েছিল। এমন ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে ঘুমপাড়ানি গুলির ‘ওভারডোজ’ সংক্রান্ত অভিযোগও উঠেছে। যদিও বনকর্তারা সে অভিযোগ মানতে নারাজ। 

তবে সব ক্ষেত্রে যে লোকালয়ে ঢুকে পড়লেই জঙ্গলে ফেরা হয় না বন্যপ্রাণের, তেমনও নয়। গত বছর এপ্রিলে ডুয়ার্সের বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের জঙ্গল ছেড়ে লতাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় সাড়ে তিন ঘণ্টা তাণ্ডব চালিয়েছিল একটি পুরুষ বাইসন। সেটিকে ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করার পরে নিমাতির জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়।

কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং জেলার একাধিক এলাকা জঙ্গল লাগোয়া। মহানন্দা থেকে জলদাপাড়া, পাতলাখাওয়া থেকে নেওড়াভ্যালি জঙ্গল লাগোয়া এলাকার বাসিন্দাদের বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর স্বভাব, আচরণ-সহ নানা ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। কারণ, বহু ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বাইসনের মতো বুনো জন্তুদের তাড়াতে লাঠিসোঁটা নিয়ে পিছু নেন বাসিন্দাদের অনেকে, তাঁরা বিস্তর দৌড়দৌড়িও করেন। তার উপর থাকে মোবাইলে ছবি তোলা থেকে থেকে নিজস্বী তোলার হিড়িক। যাতে বুনোদের বাগে আনতে অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যায় পড়েন বনকর্মীরা। কোচবিহারের কাটামারির ঘটনা নিয়েই এক বনকর্মী আক্ষেপের সুরে জানিয়েছেন ঘুম পাড়ানি গুলিতে কাবু করার পরেও বাইসনটিকে ঘিরে উপচে পড়া ভিড়ের কথা। সে সব সামলে বাইসনটিকে গাড়িতে তুলে জঙ্গলের পথে রওনা হওয়া কম ঝক্কির ব্যাপার ছিল না। বাসিন্দাদের এই অতি-উৎসাহের প্রবণতা না কমলেও ঘোরতর সমস্যা।

বন্যপ্রাণ কী কারণে এত বিপন্ন উত্তরবঙ্গে, তা নিয়ে চাপানউতোরের অন্ত নেই। ঘটনা হল, কোনও পক্ষই এই সহজ কথাটা বুঝে উঠতে পারছে না যে, চাপানউতোর বা তরজার চেয়ে ঢের বেশি জরুরি বন্যপ্রাণ রক্ষা করা। এই বুঝতে না পারার পিছনে অবশ্য বন্যপ্রাণ বিষয়ে লাগামছাড়া অজ্ঞানতাও অন্যতম বড় কারণ।

জঙ্গলের পরিসর কমে যাওয়া,  বন্যপ্রাণের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র কমে যাওয়া, খাদ্যের সঙ্কট তৈরি হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির কারণেই উত্তরোত্তর বাড়ছে লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর ঢুকে পড়ার ঘটনা। এবং এ সবের দায় মানুষেরই। এ অবস্থায় লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাইসন বা অন্য যে কোনও বন্যপ্রাণীকে যাতে জীবনের বিনিময়ে খেসারত চোকাতে না হয়, সেই পরিস্থিতিই অবিলম্বে তৈরি হওয়া দরকার। খুব জরুরি এটা বোঝা যে, এ পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, বন্যপ্রাণেরও। 

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)