মানুষ কি স্বভাবগত ভাবেই বিশৃঙ্খল প্রাণী? শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রবণতা কি মানবস্বভাবের একটি প্রধান উপাদান? না কি কলিকাতার মানুষ আলাদা প্রজাতি, তাঁহার স্বভাবে এই প্রবণতা বিশেষ জোরালো? প্রশ্নটি ভাবাইয়া তোলে। ইহাও ঠিক, এই শহরের মানুষের আবার প্রতিবাদী বলিয়া খ্যাতি আছে। তাঁহাদের অন্তরের অন্তঃস্থিত প্রতিবাদ-প্রবণতার প্রকাশ তাই শৃঙ্খলা ভাঙিবার মধ্যে। কে বলিতে পারে, বিশেষ কোনও জীবাণুই হয়তো ওই বিশেষ প্রবণতাটির হেতু। কলিকাতাবাসী গাড়ির স্টিয়ারিং-এ বসিলে গাড়ি চালাইবার নিয়ম মানেন না, সিগন্যাল ও গতিসীমা মানিয়া চলা তাঁহার চরিত্রবিরুদ্ধ। রাস্তায় পায়ে হাঁটিলে তিনি হাঁটিবার নিয়ম মানেন না, জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটব্রিজ তাঁহার কাছে পরিহাসের নামান্তর। পুলিশ হইয়া বসিলে তাঁহার বিবেচনাশক্তি লোপ পায়, দুর্বিবেচনাই হয় রীতি এবং নীতি। সর্ববিরাজমান এই বিশৃঙ্খলায় মাঝে মাঝে চকিত রাশ পড়ে কেবল হঠাৎ কোনও দুর্ঘটনা ঘটিয়া গেলে। চিংড়িঘাটার ক্ষেত্রে যেমন হইল। হঠাৎ শোনা গেল, সেখানে ফুটব্রিজ হইবে, সাবওয়ে হইবে, যাতায়াতকারীদের সুবিধার্থে সিগন্যালে পরিবর্তন হইবে, এমনকী যাতায়াতকারীদের যাতায়াতের জন্য পথ অর্থাৎ ফুটপাতও তৈরি হইবে! শুধু তাহাই নহে। পথ-নিরাপত্তার সমীক্ষাও তৈরি হইবে। কিমাশ্চর্যম্! এত শত পরিকল্পনা লওয়া এবং কার্যকর করা যদি এত সহজই ছিল, তবে দুটি প্রাণঘাতের জন্য তাহা অপেক্ষা করিতেছিল কেন?

কেন, তাহা বিশৃঙ্খলার ডিএনএ-ই বলিয়া দিতে পারে। সকল পদার্থ যেমন পঞ্চভূতে বিলীন হয়, কলকাতা শহরের সমস্ত ট্রাফিক পরিকল্পনাও বিশৃঙ্খলা হইতেই জন্ম লয়, বিশৃঙ্খলাতেই বিলীন হয়। চিংড়িঘাটাতেও দুর্ঘটনা ঘটিল বলিয়াই মানুষের দাবি সামনে উঠিয়া আসিল। সেই দাবির উত্তরে পরিকল্পনাসমূহ ঘোষিত হইল। দুর্ঘটনা না ঘটিলে এমন ঘটিত না। নাগরিক জানেন, দুর্ঘটনার রেশ মিলাইলেই সচেতনতাও বিলুপ্ত হইবে, দাবিগুলি শুকাইয়া মরিয়া যাইবে, যেটুকু যাহা পরিকল্পনা কার্যকর হইবে, তাহা অতীতের পরপার হইতে আসা বিস্মৃত স্মৃতির মতো ধূসর টিমটিম করিবে। ঠিক যেমন হইয়াছে, উলটাডাঙা মোড় কিংবা ভিআইপি রোডের উপর ফুটব্রিজগুলির ক্ষেত্রে। দুর্ঘটনা এড়াইতেই এক দিন তাহাদের জন্ম হইয়াছিল। এখন তাহারা অনাদরে অবহেলায় গ্রস্ত, তাহাদের লোহায় জং ভর্তি, তাহাদের সিঁড়িতে আগাছা ক্রমে পদক্ষেপ-প্রতিরোধক জঙ্গল। মানুষ তাহার ডিএনএ-নিষিক্ত বিশৃঙ্খলায় ফিরিয়া গিয়াছে। ফুটব্রিজ মাথার উপরে রাখিয়া ব্যস্ত ত্রস্ত বিপর্যস্ত ভাবে তাহারা রাস্তা দিয়াই মোড় পারাপার করে, গাড়ির স্পিড অনুমান করিয়া দৌড়-খেলায় মাতে।

সুতরাং এই শহরে ট্রাফিক পরিকল্পনা আর ট্রাফিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে আদৌ বিরোধ নাই। পরিকল্পনার অর্থ তো তাহা মানিবার বাধ্যবাধকতা নয়! পথচারীরা অমান্যকারী, তাঁহাদের জন্য এই শহরে ফুটপাত নাই, ফুটপাত হয় হকারের কবলে নয়তো ভাঙাচোরা গর্তের খোবলে। গাড়িচালকরা অমান্যকারী, কেননা তাঁহাদের জন্য সর্বজনীন আইন নাই। পুলিশ মান্যতাবিমুখ, কেননা আইন যেটুকু আছে, গাড়িচালক ও পথপ্রব্রজকরা চব্বিশ ঘণ্টা তাহাকে বুড়া আঙুল দেখান। সুতরাং এই সুগভীর বিশৃঙ্খলা-জাল ভেদ করিয়া সমস্যা সমাধানের আশা নাই। অনেক সময় পরিকল্পনা আবার সমস্যাকে বাড়াইয়াও তোলে। যেমন, সাবওয়ে ফ্লাইওভার মেট্রো তৈরির অনিঃশেষ প্রক্রিয়া পথপরিসরকে আরওই কমাইয়া দেয়। কিংবা পথিমধ্যে নীল-সাদা আলোয় মোড়া ল্যাম্পপোস্টে হাত লাগিয়া গেলে শক-এ মৃত্যুবরণ করিতে হয়। সুতরাং, কলকাতা জানে, এখানে বিশৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা পরস্পরবিরোধী নয়, পরস্পরের পরিপূরক।