একটি শহরের দুই প্রান্তে দুইটি নারী নির্যাতনের ঘটনায় সম্পূর্ণ বিপরীত দুইটি চিত্র। দুইটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া এত আলাদা রকমের কেন? উত্তরের খোঁজটি জরুরি। প্রথম ঘটনাটির অকুস্থল দক্ষিণ কলিকাতা। বর্ষবরণের রাত্রে নৈশভোজের পর পদ্মপুকুর রোড ধরিয়া ফিরিবার সময় গাড়ি থামাইয়া দুই তরুণীকে যৌন হেনস্থা করা হয়, তাঁহাদের পোশাক ছিঁড়িয়া দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করায় সঙ্গী যুবককে প্রহার করিয়া মাথা ফাটাইয়া দেওয়া হয়। কিন্তু তাণ্ডব চলাকালীন চারিপাশ হইতে একটি সাহায্যের হাতও আগাইয়া আসে নাই। অথচ, ঘটনাস্থলের সামান্য দূরত্বে থানা ছিল, রাস্তায় জনমানবও ছিল, সর্বোপরি, ইংরেজি বর্ষবরণের রাতে যে এমন কাণ্ড হইতে পারে সেই অনুমানও ছিল। কার্যক্ষেত্রে সবই বিফলে গেল। নিগ্রহ, প্রহার ও হুমকি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত প্রাণটি যে কাহারও খোয়া যায় নাই, তাহা নেহাতই ভাগ্যের অনুগ্রহ। এই শহর ট্রাফিক সার্জেন্ট বাপি সেনের মৃত্যু দেখিয়াছে বর্ষবরণের রাত্রে। ষোলো বৎসর পর একই দিনে দক্ষিণ কলিকাতার অভিজাত অঞ্চলে যৌন হেনস্থায় সামাজিক নির্বিকারত্ব প্রমাণ করিয়া দিল, কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই। সে বর্ষবরণের রাত্রি জাগিয়া উৎসব করিতে শিখিয়াছে, কিন্তু পাশের মানুষটি বিপদগ্রস্ত হইলে তাহার পাশে দাঁড়াইবার সহজ সাধারণ শিক্ষাটি ভুলিয়া গিয়াছে। 

ইহা একটি চিত্র। নিউটাউন সংলগ্ন চিনার পার্কের ঘটনাটি আক্ষরিক অর্থেই ‘অন্য’ রকম। সেখানে প্রতিবাদ হইয়াছে। প্রথম প্রতিবাদী চড়টি আসিয়াছে যৌন হেনস্থার শিকার তরুণীটির হাত হইতেই। পরবর্তী প্রতিঘাত তাঁহার স্বামীর দিক হইতে। এবং তরুণ দম্পতিকে সাহায্য করিতে ছুটিয়া আসিয়াছেন স্থানীয় মানুষজনরা। ফল? অপরাধী সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়িয়াছে। জনগণের ক্ষোভের মুখে নড়িয়া বসিয়াছে পুলিশ-প্রশাসন। আশ্বাস মিলিয়াছে দ্রুত শাস্তিদানের। নারী নিগ্রহের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ইহাকে ব্যতিক্রম বলা ছাড়া উপায় নাই। অথচ যে কোনও সুস্থ, সচেতন সমাজে ইহা ব্যতিক্রমের বদলে স্বাভাবিক ঘটনা হইবারই কথা ছিল। চোখের সামনে কোনও মহিলার সম্মান লুণ্ঠিত হইতে দেখিয়া চারিপাশের শুভবোধসম্পন্ন মানুষের ছুটিয়া আসিবারই কথা ছিল। এবং মানুষ ছুটিয়া আসিলে, নড়িয়া বসিলে যে ফল পাওয়া যায়, উপরের ঘটনাই তাহার প্রমাণ। 

অর্থাৎ চলতি যুক্তিটিকে উল্টাইয়া বলা যায় যে বৃহত্তর সমাজ অসচেতন হইয়া গিয়াছে বলিয়াই পুলিশ-প্রশাসনের পক্ষেও আজ কর্তব্যে এতখানি ঢিলা দেওয়া সম্ভব হইয়াছে। অন্যায় দেখিলে রুখিয়া দাঁড়ানোর ধারািট সমাজ হইতে উধাও হইয়া গিয়াছে বলিয়াই আজ প্রশাসন অকর্মণ্য হইলে কাহারও কিছু বলিবার নাই। মুশকিল এখানেই। গণতান্ত্রিক দেশ সত্তর বৎসরে পড়িলেও যদি ব্যক্তিনাগরিকের বোধবুদ্ধি নৈতিকতা কিছুই বিকশিত না হয়, প্রত্যেকে যদি কেবল নিজেরটা সামলাইতেই ব্যস্ত থাকেন, তবে শত আইন প্রণয়ন করিয়াও অপরাধের প্রসার আটকানো সম্ভব নহে। গা-বাঁচানো স্বার্থপর সমাজ তখন নিগৃহীতাদের চরিত্র, পোশাক, বাড়ি ফিরিবার সময় লইয়া প্রশ্ন তোলে। নিগৃহীতারাও মুখ বুজিয়া থাকা অভ্যাস করিয়া লন। আর চিনার পার্কের মতো ঘটনাগুলি ‘ব্যতিক্রম’ হইতে থাকে।